বডি পাপেট থিয়েটার, ভূতের গল্প ও সরাসরি সংগীতের অভিনব মেলবন্ধনে ফরাসি ও বাংলাদেশি শিল্পীদের অনন্য পরিবেশনা

বাংলার লোককথা, ভূতের গল্প, নগরজীবনের বাস্তবতা আর সুন্দরবনের রহস্যময় প্রকৃতি—সবকিছু মিলিয়ে ঢাকার মঞ্চে সৃষ্টি হয়েছিল এক ভিন্নধর্মী নাট্যজগৎ। বডি পাপেট থিয়েটার, সরাসরি সংগীত পরিবেশনা এবং পরাবাস্তব গল্প বলার অভিনব সমন্বয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করেছে ‘ইনভিজিবল স্টোরিজ: বডি পাপেট থিয়েটার উইথ লাইভ মিউজিক ফ্রম দ্য সুন্দরবনস’।
৬ নভেম্বর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে নাটকটির প্রথম প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। অ্যালিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকা, কম্পানি গ্রেইন দ্য ভি এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির যৌথ আয়োজনে মঞ্চস্থ এই প্রযোজনা বাংলাদেশের সমৃদ্ধ মৌখিক ঐতিহ্য, লোকবিশ্বাস, সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার এবং অতিপ্রাকৃত জগতের সঙ্গে মানুষের রহস্যময় সম্পর্ককে এক নতুন শিল্পভাষায় উপস্থাপন করে।
বিশিষ্ট ফরাসি পাপেটশিল্পী লরি কানাকের (Laurie Cannac) পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় নির্মিত ‘ইনভিজিবল স্টোরিজ’ অনুসন্ধান করেছে অতিপ্রাকৃত বিশ্বাস, মানুষের দৈনন্দিন জীবন এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যকার অদৃশ্য সংযোগ। বাংলাদেশের শিল্পী ও বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রাণিত এই প্রযোজনা বাংলাদেশের মানুষের সহনশীলতা, রসবোধ, আশাবাদ ও প্রজ্ঞার প্রতি এক সৃজনশীল শ্রদ্ধার্ঘ্য।
নাটকের কাহিনির কেন্দ্রে রয়েছেন দুই বিজ্ঞানী, যাঁরা ঢাকার দৈনন্দিন জীবনে ভূতের প্রভাব অনুসন্ধানে বের হন। বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া তাঁদের যাত্রা ক্রমেই রূপ নেয় এক বিস্ময়কর অভিযানে। একসময় মানুষের পরিচিত জগৎ ও অতিপ্রাকৃত জগতের মধ্যকার সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে আসে। ব্যস্ত নগরজীবন পেরিয়ে তাঁদের অভিযান পৌঁছে যায় রহস্যময় বনভূমি ও জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ সুন্দরবনে। সেখানে উন্মোচিত হয় মানুষ, প্রকৃতি এবং মানবজীবনকে প্রভাবিত করা অদৃশ্য শক্তির মধ্যকার নানা অপ্রত্যাশিত সম্পর্ক।
বাংলার ঐতিহ্যবাহী ভূতের গল্পকে উপজীব্য করে নাটকটি ঢাকাকে উপস্থাপন করেছে এক পরাবাস্তব মহানগরী হিসেবে। যানজটের দুর্ভোগ, দ্রুত নগরায়ণ এবং নাগরিক জীবনের পরিচিত নানা সংকটও এখানে পেয়েছে ভিন্ন মাত্রা। প্রাচীন লোকবিশ্বাসের সঙ্গে সমকালীন সামাজিক ও পরিবেশগত বাস্তবতার সংযোগ ঘটিয়ে প্রযোজনাটি একদিকে যেমন কৌতুকের আবহ তৈরি করে, অন্যদিকে তেমনি দর্শকদের ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে সাংস্কৃতিক স্মৃতি, পরিবেশ সচেতনতা এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের চিরন্তন সম্পর্ক নিয়ে।
লরি কানাক ও স্বাতী ভদ্রের অভিনয়ের পাশাপাশি নোনাভূমি অর্গানাইজেশনের সরাসরি সংগীত পরিবেশনা নাটকটিকে দিয়েছে স্বতন্ত্র প্রাণ। শারীরিক অভিব্যক্তিনির্ভর বডি পাপেট থিয়েটার এবং সংগীতের সম্মিলিত আবহে গল্প ও চরিত্রগুলো হয়ে উঠেছে জীবন্ত ও অনুভবযোগ্য। ফরাসি ও বাংলাদেশি শিল্পীদের এই যৌথ সৃজনশীল প্রয়াসে লোকজ ঐতিহ্য, সমকালীন নাট্যনিরীক্ষা এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের এক চমৎকার উদাহরণ তৈরি হয়েছে।
প্রথম দিনের প্রদর্শনীটি ইংরেজি ও বাংলায় পরিবেশিত হয়, ফলে ভিন্ন ভাষা ও সাংস্কৃতিক পটভূমির দর্শকরাও নাটকটির গল্প ও শিল্পভাষার সঙ্গে সহজে সংযুক্ত হওয়ার সুযোগ পান।
প্রথম দিনের সফল পরিবেশনার ধারাবাহিকতায় ‘ইনভিজিবল স্টোরিজ’-এর দ্বিতীয় প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে ৭ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে। দ্বিতীয় দিনের পরিবেশনা হবে ফরাসি ও বাংলায়।
দ্বিতীয় দিনের প্রদর্শনী সবার জন্য উন্মুক্ত এবং প্রবেশ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আসন গ্রহণের ক্ষেত্রে ‘আগে এলে আগে পাবেন’ ভিত্তিতে দর্শকদের প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হবে।
লোককথার কল্পজগৎ, প্রকৃতির রহস্য আর মানুষের চিরন্তন অনুভূতিকে মঞ্চে একসূত্রে গেঁথে ‘ইনভিজিবল স্টোরিজ’ হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক বিনিময়ের এক ব্যতিক্রমী আয়োজন—যেখানে দৃশ্যমান গল্পের আড়ালে উঁকি দেয় বাংলার অদৃশ্য অথচ গভীর সাংস্কৃতিক স্মৃতি।
ভ্রমণডেস্ক