দুই দেশ, এক পর্দা: চলচ্চিত্রে রাশিয়া–বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন

চলচ্চিত্র শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি একটি জাতির সংস্কৃতি, ইতিহাস, জীবনবোধ ও মানবিক অনুভূতি প্রকাশের শক্তিশালী শিল্পমাধ্যম। ভাষা ও ভৌগোলিক দূরত্ব অতিক্রম করে চলচ্চিত্র মানুষের সঙ্গে মানুষের, সংস্কৃতির সঙ্গে সংস্কৃতির এবং দেশের সঙ্গে দেশের সম্পর্ককে আরও গভীর করে তোলে। সেই সাংস্কৃতিক সংযোগেরই এক সৃজনশীল উদাহরণ হয়ে উঠল ঢাকায় আয়োজিত বিশেষ চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ‘রাশিয়া–বাংলাদেশ: দুই দেশ, এক পর্দা’।

১৫ অক্টোবর ২০২৬, ঢাকার ধানমন্ডিতে ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল মোবাইল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল (ডিআইএমএফএফ) ঢাকাস্থ রুশ হাউসের সহযোগিতায় এই ব্যতিক্রমী চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করে। দুই দেশের চলচ্চিত্র, সংস্কৃতি ও গল্প বলার স্বতন্ত্র ঐতিহ্যকে কাছ থেকে জানার সুযোগ তৈরি করতে অনুষ্ঠানে অংশ নেন শিক্ষার্থী, চলচ্চিত্র নির্মাতা, শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা।

ছয়টি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, দুই দেশের গল্প

অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিল ডিআইএমএফএফের জন্য নির্বাচিত রাশিয়া ও বাংলাদেশের মোট ছয়টি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী। দুই দেশের তিনটি করে চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে দর্শকেরা উপভোগ করেন ভিন্ন ভিন্ন সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গি, গল্প বলার কৌশল এবং চলচ্চিত্রের ভাষায় জীবনের নানা অনুষঙ্গ তুলে ধরার প্রচেষ্টা।

রাশিয়ার চলচ্চিত্রগুলো ছিল—

১. দ্য শেল (The Shell) — পরিচালক: ওলেগ কন্দ্রাতিয়েভ।

২. রাস্পবেরি (Raspberry) — পরিচালক: মারিয়া সের্গেয়েভনা ক্লেনোভস্কায়া।

৩. ওয়ান মিনিট (One Minute) — পরিচালক: ইলনুর মুখামবেতালিয়েভ।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রগুলো ছিল—

১. সাউন্ড অব সাইলেন্স (Sound of Silence) — পরিচালক: শৌমিক বকশী দীপ্ত।

২. গুডবাই (Goodbye) — পরিচালক: জান্নাতুল ফেরদৌস আঁখি।

৩. হুরুমতুরুম (Hurumturum) — পরিচালক: সোহান শেখ।

ছয়টি চলচ্চিত্রের এই সম্মিলিত উপস্থাপনা দর্শকদের সামনে দুটি দেশের চলচ্চিত্র নির্মাণের সৃজনশীল বৈচিত্র্য তুলে ধরার পাশাপাশি চলচ্চিত্রকে ভিন্ন সংস্কৃতি ও অভিজ্ঞতা জানার একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে উপলব্ধি করার সুযোগ সৃষ্টি করে।

সংস্কৃতির সীমানা পেরিয়ে চলচ্চিত্রের সংযোগ

অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী পর্বে ঢাকাস্থ রুশ হাউসের পরিচালক মিসেস আলেকজান্দ্রা এ. খ্লেভনয় রাশিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক সহযোগিতা জোরদারের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি তরুণ প্রজন্মকে সৃজনশীলতা বিকাশ, নতুন ধারণা অন্বেষণ এবং সাংস্কৃতিক ও শৈল্পিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিরন্তর জ্ঞান অর্জনের আহ্বান জানান।

তাঁর বক্তব্যে আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে তরুণদের অংশগ্রহণ এবং শিল্প-সাহিত্যের বিভিন্ন মাধ্যমের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার গুরুত্ব প্রতিফলিত হয়।

ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব)-এর স্কুল অব সোশ্যাল সায়েন্সেসের ডিন এবং মিডিয়া স্টাডিজ অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. সুমন রহমান অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের স্বাগত জানান। তিনি মানুষের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন, বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির বিনিময় এবং বিভিন্ন সংস্কৃতির প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়া বৃদ্ধিতে চলচ্চিত্রের ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

চলচ্চিত্রের বিশেষত্ব এখানেই—একটি গল্পের পটভূমি ভিন্ন দেশের হলেও তার আবেগ, দ্বন্দ্ব, স্বপ্ন কিংবা মানবিক আবেদন অন্য দেশের দর্শকের কাছেও অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে। এই অভিন্ন মানবিক অনুভূতিই চলচ্চিত্রকে আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক সংলাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম করে তুলেছে।

তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সৃজনশীল গল্প বলার গুরুত্ব

ডিআইএমএফএফের প্রশিক্ষক মীর ওয়াদুদ ইসলাম চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর তাৎপর্য এবং গল্প বলার মাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্র নির্মাণের ভূমিকা নিয়ে বক্তব্য দেন। তরুণ নির্মাতাদের জন্য এ ধরনের আয়োজন চলচ্চিত্রের ভাষা, সৃজনশীল প্রকাশ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের কাজ উপস্থাপনের সম্ভাবনা সম্পর্কে ধারণা লাভের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র তৈরি করে।

অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্য দেন ডিআইএমএফএফের উৎসব পরিচালক সোহান শেখ। এরপর ডিআইএমএফএফ ২০২৭-এর উপদেষ্টা সায়েদা সাদিয়া মেহজাবিন ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।

চলচ্চিত্র থেকে সাংস্কৃতিক কূটনীতির নতুন সম্ভাবনা

রাশিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও বহুমাত্রিক করার ক্ষেত্রে সংস্কৃতি ও সৃজনশীল শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। চলচ্চিত্র উৎসব, যৌথ প্রদর্শনী, তরুণ নির্মাতাদের অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং চলচ্চিত্রবিষয়ক আলোচনা দুই দেশের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক পরিচিতি বাড়ানোর পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কূটনীতির নতুন সুযোগও সৃষ্টি করতে পারে।

বিশেষ করে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের মতো সৃজনশীল মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের নির্মাতারা সীমিত সময়ের মধ্যে নিজস্ব ভাবনা, সামাজিক বাস্তবতা ও মানবিক অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে পারেন। আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীর মাধ্যমে তাঁদের কাজ অন্য দেশের দর্শকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়, যা ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত সহযোগিতার পথ উন্মুক্ত করতে পারে।

পর্যটন ও সংস্কৃতির পারস্পরিক সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ থেকেও এ ধরনের উদ্যোগের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। একটি দেশের চলচ্চিত্র, সংগীত, শিল্পকলা ও জীবনযাত্রার সঙ্গে পরিচিতি মানুষের মধ্যে সেই দেশকে সরাসরি জানার আগ্রহ তৈরি করতে পারে। এভাবেই সাংস্কৃতিক বিনিময় পর্যটন, শিক্ষা ও জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক উন্নয়নের সহায়ক হয়ে উঠতে পারে।

এক পর্দায় অভিন্ন মানবিকতার বার্তা

‘রাশিয়া–বাংলাদেশ: দুই দেশ, এক পর্দা’ শীর্ষক চলচ্চিত্র প্রদর্শনীটি দুই দেশের নির্বাচিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রকে একই মঞ্চে উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে সৃজনশীলতা, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার গুরুত্ব তুলে ধরেছে।

এ ধরনের উদ্যোগ নিয়মিত আয়োজন করা গেলে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার চলচ্চিত্র নির্মাতা, শিক্ষার্থী এবং সংস্কৃতিকর্মীদের মধ্যে যোগাযোগ আরও গভীর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে চলচ্চিত্রকে কেন্দ্র করে দুই দেশের শিল্প, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও পর্যটন খাতে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্রও বিকশিত হতে পারে।

পর্দায় গল্প ছিল দুই দেশের, কিন্তু সেই গল্পের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে মানুষের অভিন্ন অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা। আর সেখানেই ‘দুই দেশ, এক পর্দা’ হয়ে উঠেছে শুধু একটি চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর শিরোনাম নয়, বরং সংস্কৃতির সীমানা পেরিয়ে মানুষকে কাছাকাছি নিয়ে আসার এক তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা।

ভ্রমণ (VROMON) ম্যাগাজিনের দৃষ্টিতে, চলচ্চিত্রভিত্তিক এ ধরনের সাংস্কৃতিক উদ্যোগ আন্তর্জাতিক বন্ধুত্ব, সৃজনশীল সহযোগিতা এবং সংস্কৃতিনির্ভর পর্যটন বিকাশে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে।

ভ্রমণডেস্ক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *