মালয়েশিয়ায় ফকির লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবসে আলোচনা, দর্শন ও লোকসংগীতের আবহে বাংলার অসাম্প্রদায়িক চেতনার উদ্যাপন..

মানুষের পরিচয় কি জাতি, ধর্ম ও বর্ণে, নাকি মানুষের আসল পরিচয় তার মানবিক সত্তায়? শতাব্দী পেরিয়েও এমন প্রশ্নের মধ্য দিয়ে মানুষকে আত্মানুসন্ধান ও মানবতার পথে আহ্বান জানিয়ে চলেছেন ফকির লালন সাঁই। তাঁর সেই কালজয়ী দর্শন, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মরমি সংগীতের স্মরণে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত হলো আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
১৮ অক্টোবর ২০২৬, ফকির লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবস উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ হাইকমিশন, কুয়ালালামপুর এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এতে লালন সাঁইয়ের জীবন, মানবতাবাদী দর্শন, বাংলা লোকসংস্কৃতিতে তাঁর অবদান এবং সম্প্রীতি ও সাম্যের বার্তা নিয়ে আলোচনা হয়।
মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি
লালন সাঁইয়ের দর্শনের অন্যতম শক্তি হলো মানুষের ভেতরের মানুষকে খুঁজে ফেরার আহ্বান। তাঁর গান দেহ, আত্মপরিচয়, আত্মানুসন্ধান ও মানবপ্রেমের গভীর তাৎপর্য তুলে ধরে। ধর্মীয় ও সামাজিক বিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার যে শিক্ষা তিনি দিয়েছেন, তা আজও সমান প্রাসঙ্গিক।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ হাইকমিশনের মিনিস্টার ও ডেপুটি হাইকমিশনার মোসাম্মৎ শাহানারা মনিকা, মালয়েশিয়া বিএনপির সভাপতি প্রকৌশলী মো. বাদলুর রহমান খান এবং মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মনজুরুল করিম খান চৌধুরী।
হাইকমিশনার মনজুরুল করিম খান চৌধুরী তাঁর বক্তব্যে লালন সাঁইয়ের কালজয়ী দর্শন ও সংগীতের দার্শনিক তাৎপর্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, লালন সাঁইয়ের গানে দেহতত্ত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এরমধ্য দিয়ে মানবদেহ, আত্মপরিচয় ও অন্তর্নিহিত সত্য অনুসন্ধানের ভাবনা প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর গান কেবল সংগীত নয়; বরং জীবন ও মানুষকে গভীরভাবে উপলব্ধি করার একটি দার্শনিক মাধ্যম।
অন্য বক্তারাও লালন সাঁইয়ের জীবনদর্শন ও সৃষ্টিকর্মের নানা দিক তুলে ধরেন। তাঁরা উল্লেখ করেন, তাঁর গান ও দর্শন জাতি, ধর্ম, বর্ণ এবং সামাজিক বিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে মানবতার জয়গান গায়। সাম্য, সহমর্মিতা, মানবপ্রেম ও পারস্পরিক সম্প্রীতির যে শিক্ষা তাঁর সৃষ্টিতে প্রতিফলিত হয়েছে, তা সমাজে মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সুরে সুরে লালনের দর্শন
আলোচনা পর্ব শেষে আয়োজন করা হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে লালন সাঁইয়ের গান পরিবেশন করেন সানওয়ে ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী আবির হাসান রাফি এবং বাংলাদেশ হাইকমিশন, কুয়ালালামপুরের কনস্যুলার অ্যাসিস্ট্যান্ট আব্দুর রাজ্জাক রাজ।
তাঁদের পরিবেশনায় লালনের মরমি সংগীত ও মানবতাবাদী দর্শন নতুন মাত্রা পায়। গানের সুরে উঠে আসে বাংলার লোকজ ঐতিহ্য, আত্মার অনুসন্ধান এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের চিরন্তন সম্পর্কের কথা। প্রবাসের মাটিতে এমন আয়োজন প্রবাসী বাংলাদেশিদের শেকড়ের সংস্কৃতির সঙ্গে সংযোগ আরও গভীর করার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলার সমৃদ্ধ লোকসংগীত তুলে ধরার সুযোগ সৃষ্টি করে।
অনুষ্ঠানে প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির নেতৃবৃন্দ ও সদস্য, মালয়েশিয়ার বিভিন্ন খাতে কর্মরত বাংলাদেশি প্রবাসী এবং বাংলাদেশ হাইকমিশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন।
সংস্কৃতির সেতুতে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া
সংস্কৃতি মানুষের পরিচয় বহন করে, আবার ভৌগোলিক দূরত্ব পেরিয়ে মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধনও গড়ে তোলে। কুয়ালালামপুরে লালন সাঁইকে ঘিরে এই আয়োজন সেই সত্যকেই নতুন করে তুলে ধরেছে। বিদেশের মাটিতে বাংলা লোকসংগীত ও দর্শনের চর্চা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিচিত করার পাশাপাশি প্রবাসী সমাজে সাংস্কৃতিক বন্ধন দৃঢ় করতে সহায়তা করে।
লালন সাঁইয়ের জীবন ও সৃষ্টি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষের ভেতরের মানবিক সত্তাকে চিনতে পারাই প্রকৃত আত্মানুসন্ধান। তাঁর গান তাই শুধু বাংলার লোকসংগীতের অমূল্য সম্পদ নয়; এটি মানবতা, সম্প্রীতি ও বিভেদহীন সমাজের এক চিরন্তন আহ্বান।
লালনের সুরে সেই আহ্বান আজও ধ্বনিত হয়—মানুষকে জানো, মানুষকে ভালোবাসো, মানুষের মধ্যেই খুঁজে নাও সত্যের আলো।
ভ্রমণডেস্ক