এক চুমুকে মালয়েশিয়া, এক বন্ধনে দুই দেশ

টিলাইভকে ঘিরে বাংলাদেশ–মালয়েশিয়া সম্পর্কের নতুন অনুষঙ্গ—স্বাদের বিনিময়ে সংস্কৃতি, ব্যবসা ও পর্যটনের সেতুবন্ধন।

এক কাপ চা কখনো কখনো বলে যেতে পারে অসাধারণ এক গল্প। এর মধ্যে ফুটে উঠতে পারে একটি দেশের সংস্কৃতি, উদ্যোক্তার স্বপ্ন, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এবং ভৌগোলিক দূরত্ব পেরিয়ে বন্ধুত্বের সেতুবন্ধন। বিশ্বায়নের এই যুগে একটি আধুনিক পানীয়ও হয়ে উঠতে পারে দুই দেশের মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য ও সহযোগিতা বৃদ্ধির অনন্য মাধ্যম।

বাংলাদেশে মালয়েশিয়ার জনপ্রিয় পানীয় ব্র্যান্ড টিলাইভের (Tealive) ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি তেমনই এক সম্ভাবনার গল্প তুলে ধরছে। রঙিন পানীয় আর আকর্ষণীয় বাবল টির অভিজ্ঞতার আড়ালে রয়েছে মালয়েশিয়ার এক উদ্যোক্তার সাফল্যগাথা। ২০১০ সালে শুরু হওয়া একটি ব্যবসায়িক উদ্যোগ ২০১৭ সালে নিজস্ব ব্র্যান্ডে রূপান্তরিত হয় এবং পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে সম্প্রসারিত হয়। ঢাকায় টিলাইভের উপস্থিতি এখন বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সম্পর্কের ক্ষেত্রে যোগ করছে নতুন মাত্রা। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি মালয়েশিয়া হাইকমিশনের চার্জ দ্য এফেয়ার্স হ্যাজওয়ান হাসনল বলেন, আমরা প্রায়ই আনুষ্ঠানিক বৈঠক, আলোচনা ও চুক্তির মাধ্যমে কূটনীতির কথা বলি। কিন্তু আমার বিশ্বাস, আরও সহজ ও আনন্দময় উপায়েও কূটনীতি হতে পারে—এক কাপ চায়ের আড্ডায়। তিনি বাংলাদেশে টিলাইভের প্রবেশ ও সম্প্রসারণকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একটি নতুন মাত্রা হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর মতে, মালয়েশীয় ব্র্যান্ডগুলোর বাংলাদেশে সম্প্রসারণ দুই দেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগ ও সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে খাদ্যসেবা ও ভোক্তাপণ্য খাতে।

টিলাইভের বাংলাদেশে কার্যক্রমকে ঘিরে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মালয়েশিয়া–বাংলাদেশ ট্যুরিজম, আর্টস অ্যান্ড কালচারাল নেটওয়ার্কের (MBTACN) নির্বাহী চেয়ারম্যান আবু সুফিয়ান। তিনি ভ্রমণবিষয়ক সাময়িকী ভ্রমণ (VROMON)-এর সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবেও বাংলাদেশে পর্যটন, সংস্কৃতি ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের প্রসারে কাজ করছেন।

বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে পর্যটন, শিল্পকলা, সংস্কৃতি, শিক্ষা এবং জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যে কাজ করছে MBTACN। এই প্রেক্ষাপটে টিলাইভের মতো মালয়েশীয় ব্র্যান্ডের বাংলাদেশে সম্প্রসারণ দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক পরিচিতি ও পর্যটন বিপণনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

যেভাবে শুরু: ২০১০ সালে এক উদ্যোক্তার স্বপ্ন

টিলাইভের আকর্ষণীয় পরিচিতির পেছনে রয়েছেন মালয়েশিয়ার উদ্যোক্তা ব্রায়ান লু (Bryan Loo), যিনি লুব হোল্ডিংয়ের (Loob Holding) প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী। ২০১০ সালের অক্টোবরে মালয়েশিয়ায় প্রথম বাবল টি আউটলেট চালুর মধ্য দিয়ে এই ব্যবসায়িক যাত্রার সূচনা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে বাবল টির ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ব্রায়ান লু মালয়েশিয়ার ভোক্তাদের কাছে এই পানীয়কে জনপ্রিয় করে তোলার সম্ভাবনা উপলব্ধি করেন।

বাবল টি, যা বোবা টি বা পার্ল মিল্ক টি নামেও পরিচিত, ১৯৮০-এর দশকে তাইওয়ানে জনপ্রিয়তা লাভ করে। চা, দুধ অথবা ফলের স্বাদ এবং চিবিয়ে খাওয়া যায় এমন ট্যাপিওকা পার্লের অনন্য সমন্বয় পানীয়টিকে একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। ধীরে ধীরে এটি এশিয়ার বিভিন্ন দেশসহ বিশ্বের নানা অঞ্চলে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। মালয়েশিয়ার বহুজাতিক খাদ্যসংস্কৃতি এবং দীর্ঘদিনের চা পানের ঐতিহ্য এই নতুন ধরনের পানীয়ের জন্য তৈরি করে অনুকূল পরিবেশ।

প্রাথমিক পর্যায়ে লুব হোল্ডিং তাইওয়ানের বাবল টি ব্র্যান্ড Chatime মালয়েশিয়ার ফ্র্যাঞ্চাইজি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবসা শুরু করে। কয়েক বছরের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আউটলেট প্রতিষ্ঠা করে এবং মালয়েশিয়ার ক্রমবর্ধমানসংখ্যক ভোক্তার কাছে বাবল টিকে পরিচিত করে তোলে।

২০১৭ সালের শুরুতে Chatime’র মূল মালিক তাইওয়ানের লা কাফা ইন্টারন্যাশনালের (La Kaffa International) সঙ্গে ব্যবসায়িক বিরোধের পর ফ্র্যাঞ্চাইজি সম্পর্কের অবসান ঘটে। এই ঘটনা প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করে। একটি প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড হারানো অনেক ব্যবসার জন্য বড় ধরনের সংকটের কারণ হতে পারত। কিন্তু ব্রায়ান লু ও তাঁর দল বেছে নেন ভিন্ন পথ—নিজেদের ব্র্যান্ড গড়ে তোলার পথ।

২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে লুব হোল্ডিং আনুষ্ঠানিকভাবে বাজারে নিয়ে আসে টিলাইভ। কুয়ালালামপুরের প্যাভিলিয়ন কুয়ালালামপুর শপিং কমপ্লেক্সে প্রথম টিলাইভ আউটলেট চালুর মাধ্যমে শুরু হয় নতুন অধ্যায়। লুব হোল্ডিংয়ের বিদ্যমান বাবল টি ব্যবসাকে একটি স্বতন্ত্র মালয়েশীয় ব্র্যান্ডে রূপান্তরের মধ্য দিয়েই টিলাইভের জন্ম। চ্যাটাইমের প্রায় ১৬৫টি সাবেক আউটলেটকে টিলাইভে রূপান্তর করা হয়। ফলে নতুন পরিচয়ে যাত্রা শুরু করলেও প্রতিষ্ঠানটি তার বিদ্যমান বাজার উপস্থিতির বড় একটি অংশ ধরে রাখতে সক্ষম হয়। এটি ছিল কোম্পানিটির ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।

মালয়েশিয়ায় আত্মপ্রকাশের পর টিলাইভ দেশের সীমানা পেরিয়ে ব্যবসা সম্প্রসারণ শুরু করে।

টিলাইভ তিনটি মহাদেশে ৯০০টিরও বেশি আউটলেট নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রচলিত বাবল টির পাশাপাশি তাদের পণ্যের তালিকায় রয়েছে হ্যান্ডক্রাফটেড টি, সিগনেচার ব্রাউন সুগার পার্ল মিল্ক টি, ফলের স্বাদের পানীয়, কফি ও স্মুদি। বাংলাদেশে টিলাইভের প্রবেশ ও সম্প্রসারণ এই আন্তর্জাতিক যাত্রারই আরেকটি ধাপ।

টিলাইভ বাংলাদেশ ঢাকার গুলশান-২ ও বনানীতে আউটলেট প্রতিষ্ঠা করেছে এবং চট্টগ্রামে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পরিচালনা করছে এঅ্যান্ডআই ফুড অ্যান্ড বেভারেজ (A&I Food and Beverage)। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশমিতা ইরাদ আলী জানিয়েছেন, বাবল টি সম্পর্কে তাঁদের পরিবারের আগ্রহ থেকেই ব্যবসায়িক উদ্যোগটির সূচনা।

এক কাপ চায়ের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হয়তো শুধু তার স্বাদে নয়; বরং সেই কাপকে ঘিরে তৈরি হওয়া কথোপকথন, গড়ে ওঠা সম্পর্ক এবং নির্মিত বন্ধুত্বের সেতুবন্ধনে।

খালিদ মুহাইমিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *