সংগীত, লাইভ অঙ্কন ও ভিডিওর সম্মিলনে ঢাকার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে ১৩ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হলো এক আনন্দময় সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা। ফরাসি শিল্পপ্রকল্প ‘Le Voyage de Rézé’ ভিন্ন সংস্কৃতি, কল্পনা ও সৃজনশীলতার মেলবন্ধনে দর্শকদের উপহার দিয়েছে এক বহুমাত্রিক শিল্প-অভিজ্ঞতা।

সুরের মূর্ছনা, কণ্ঠের আবেশ, গিটারের ঝংকার, পারকাশনের ছন্দ, অঙ্কনের রেখা আর ভিডিওর দৃশ্য—শিল্পের এই বহুমাত্রিক উপাদানগুলোকে একসূত্রে গেঁথে ঢাকার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে অনুষ্ঠিত হয়েছে ব্যতিক্রমধর্মী শিল্পপরিবেশনা লে ভোয়াজ দ্য রেজে (Le Voyage de Rézé)। অ্যালিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকা ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই পরিবেশনা দর্শকদের সামনে তুলে ধরেছে সঙ্গীত ও দৃশ্যশিল্পের সমন্বয়ে নির্মিত এক সৃজনশীল ভ্রমণ, যেখানে শিল্প হয়ে উঠেছে সংস্কৃতি, মানুষ ও অভিজ্ঞতার মধ্যে সেতুবন্ধনের মাধ্যম।
Les Productions du Bazar-এর প্রযোজনায় নির্মিত এই শিল্পপ্রকল্প প্রচলিত কনসার্টের ধারণাকে অতিক্রম করে সঙ্গীত, লাইভ স্কেচ, আলোকচিত্র ও ভিডিওকে এক অভিন্ন শিল্পভাষায় রূপ দিয়েছে। চারজন শিল্পীর সম্মিলিত সৃজনশীলতায় মঞ্চে তৈরি হয়েছে এমন এক অভিজ্ঞতা, যেখানে দর্শক শুধু গান শোনেননি; বরং সুরের সঙ্গে দৃশ্যের বিকাশ, রেখার চলমান ভাষা এবং বিভিন্ন সংস্কৃতির গল্পেরও অংশ হয়েছেন।
১৩ অক্টোবরের এই আনন্দময় সন্ধ্যায় শিল্পী ও দর্শকদের সম্মিলিত উপস্থিতি অনুষ্ঠানটিকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। বিশেষ করে একোল ফ্রঁসেজ ইন্টারন্যাশনাল দ্য ঢাকা (École Française Internationale de Dacca—EFID)-এর শিক্ষার্থীদের উৎসাহপূর্ণ অংশগ্রহণ পরিবেশনায় যোগ করে আনন্দের এক বিশেষ মাত্রা। তাঁদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি ও সম্পৃক্ততা শিল্পের প্রতি তরুণ প্রজন্মের আগ্রহ এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের সম্ভাবনাকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে।
পরিবেশনা শেষে শিল্পী ও দর্শকদের মধ্যে প্রাণবন্ত মতবিনিময় সন্ধ্যাটিকে আরও স্মরণীয় করে তোলে। সঙ্গীত, শিল্প, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতা নিয়ে এই সরাসরি কথোপকথন মঞ্চের অভিজ্ঞতাকে ছাড়িয়ে পারস্পরিক পরিচয় ও বোঝাপড়ার এক আন্তরিক পরিসর তৈরি করে। আয়োজকদের পক্ষ থেকে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী সবাইকে এবং বিশেষভাবে EFID-কে এই সুন্দর সাংস্কৃতিক মিলনমেলাকে সফল ও স্মরণীয় করে তোলার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানানো হয়।
শিল্পের ভাষায় ভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয়
লে ভোয়াজ দ্য রেজে কেবল একটি মঞ্চ পরিবেশনা নয়; এটি মানুষ, সংস্কৃতি ও অনুভূতির মধ্যে সংযোগ তৈরির একটি সম্মিলিত শিল্পযাত্রা। বিভিন্ন দেশ ও সংস্কৃতির গান, শিল্পীদের নিজস্ব সৃষ্টি, পরিচিত সুর এবং নতুনভাবে আবিষ্কৃত সংগীতের সমন্বয়ে পরিবেশনাটি পেয়েছে বৈচিত্র্যময় রূপ।
সঙ্গীতের পাশাপাশি মঞ্চে লাইভ অঙ্কনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে ফুটে উঠেছে গানের আবহ, মানুষের অভিজ্ঞতা এবং স্থান ও সময়ের গল্প। অন্যদিকে, ভিডিও ও আলোকচিত্র পরিবেশনার দৃশ্যগত মাত্রাকে করেছে আরও সমৃদ্ধ। ফলে শব্দ ও দৃশ্য এখানে পৃথক কোনো উপাদান নয়; বরং একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছে।
এই সমন্বিত শিল্পভাষা দর্শকদের সামনে নতুনভাবে তুলে ধরেছে পরিচিত ও অপরিচিত সংস্কৃতিকে জানার সম্ভাবনা। একই সঙ্গে এটি স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, সাংস্কৃতিক বিনিময় মানে শুধু একটি সংস্কৃতিকে অন্যটির সামনে উপস্থাপন করা নয়; বরং পারস্পরিক অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়া, প্রশ্ন করা, বোঝার চেষ্টা করা এবং নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলা।
চার শিল্পীর সৃজনশীল সম্মিলন
এই বহুমাত্রিক শিল্পযাত্রার কেন্দ্রে রয়েছেন চারজন শিল্পী। তাঁদের স্বতন্ত্র অভিজ্ঞতা, শিল্পচর্চা ও সৃজনশীল প্রকাশের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে লে ভোয়াজ দ্য রেজে-এর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য।
রেজে (Rézé) একজন গিটারবাদক, গায়ক ও সুরকার। জ্যাজের পাশাপাশি আফ্রিকান ও ব্রাজিলীয় সংগীতের বিভিন্ন ঐতিহ্যের প্রভাব তাঁর সংগীতচর্চায় প্রতিফলিত হয়। নিজস্ব সুর ও বৈচিত্র্যময় সংগীতধারার সংমিশ্রণে তিনি পরিবেশনায় যুক্ত করেছেন বহুসাংস্কৃতিক সংগীতভাষা।
সোফিরান (Sofiran) একজন পারকাশনবাদক ও কণ্ঠশিল্পী। আফ্রিকান, আফ্রো-কিউবান ও ব্রাজিলীয় সংগীতের বিভিন্ন ধারার সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের পরিচয় ও চর্চা পরিবেশনায় এনেছে ছন্দের শক্তি, প্রাণবন্ততা ও গতিশীলতা।
এমে (Emé) একজন শিল্পী, ইলাস্ট্রেটর ও লাইভ স্কেচশিল্পী। মানুষ, স্থান এবং পারস্পরিক সাক্ষাতের মুহূর্ত তাঁর শিল্পচর্চার গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। পরিবেশনার সময় তাৎক্ষণিক অঙ্কনের মধ্য দিয়ে তিনি দর্শকদের সামনে দৃশ্যমান করে তোলেন পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতার নানা দিক। তাঁর আঁকা রেখা সঙ্গীতের সঙ্গে সমান্তরালে এগিয়ে গিয়ে মঞ্চে সৃষ্টি করে এক চলমান দৃশ্যকাহিনি।
ক্রিস্তো (Christoo) ভিডিও, ফটোগ্রাফি ও শিল্প-প্রযোজনার সঙ্গে যুক্ত একজন সৃজনশীল শিল্পী। পরিবেশনার মঞ্চ-পরিচালনা ও দৃশ্যকাহিনি নির্মাণে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সঙ্গীত ও লাইভ অঙ্কনের সঙ্গে ভিডিও এবং আলোকচিত্রের সমন্বয় পরিবেশনাটিকে দিয়েছে আরও বিস্তৃত ও সমকালীন শিল্পরূপ।
চার শিল্পীর এই স্বতন্ত্র অথচ পরস্পর-পরিপূরক শিল্পচর্চা প্রমাণ করে, সৃজনশীলতার কোনো একক ভাষা নেই। সুর, শব্দ, রেখা, ছবি ও গতিশীল দৃশ্যের সম্মিলনে শিল্প এমন একটি পরিসর তৈরি করতে পারে, যেখানে বিভিন্ন অভিজ্ঞতা ও সংস্কৃতি একে অপরের সঙ্গে সংলাপে যুক্ত হয়।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে সাংস্কৃতিক সংযোগ
ফ্রান্সের বিভিন্ন থিয়েটার, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, স্কুল, গ্রন্থাগার ও উৎসবে পরিবেশিত হয়েছে এই শিল্পপ্রকল্প। ফ্রান্সের বাইরেও রিইউনিয়ন, এল সালভাদর, বুরকিনা ফাসো ও ব্রাজিলসহ বিভিন্ন দেশে শিল্পীরা তাঁদের কাজ উপস্থাপন করেছেন।
এই যাত্রার পরিধি শুধু মঞ্চ পরিবেশনায় সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন আয়োজনে শিল্পীদের সঙ্গে মতবিনিময়, কর্মশালা, প্রদর্শনী এবং ভ্রমণ-অভিজ্ঞতা নিয়ে তৈরি জার্নালও প্রকল্পটির অংশ হিসেবে গুরুত্ব পেয়েছে। এর মাধ্যমে শিল্পীরা স্থানীয় মানুষ ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ পেয়েছেন।
ঢাকায় অনুষ্ঠিত পরিবেশনাটিও সেই বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ধারার সঙ্গে যুক্ত। এর মাধ্যমে বাংলাদেশি দর্শকদের সামনে ফরাসি ও আন্তর্জাতিক শিল্পচর্চার একটি বহুমাত্রিক রূপ উপস্থাপিত হয়েছে। একই সঙ্গে এটি সাংস্কৃতিক কূটনীতি ও জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ জোরদারে শিল্পের সম্ভাবনাকে নতুনভাবে তুলে ধরেছে।
শিল্পচর্চা যখন হয়ে ওঠে শেখার মাধ্যম
লে ভোয়াজ দ্য রেজে-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর শিক্ষামূলক ও অংশগ্রহণমূলক দর্শন। প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত শিল্পীরা বিভিন্ন প্রজন্মের অংশগ্রহণকারীদের নিয়ে সঙ্গীত, ছন্দ ও পারকাশন, অঙ্কন, ফটোগ্রাফি এবং ভিডিওভিত্তিক কর্মশালা পরিচালনা করেন।
এই কর্মশালাগুলোতে শিল্পকে শুধু নান্দনিক প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে দেখা হয় না; বরং জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও সৃজনশীলতা ভাগ করে নেওয়ার একটি কার্যকর পদ্ধতি হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। এর মধ্য দিয়ে অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের ভাবনা প্রকাশ, অন্যের অভিজ্ঞতা উপলব্ধি এবং সম্মিলিতভাবে নতুন কিছু সৃষ্টির সুযোগ পান।
এ ধরনের উদ্যোগ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, শিল্প যখন মঞ্চের বাইরে শিক্ষা, সংলাপ ও অংশগ্রহণের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তা সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি ও প্রজন্মের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
ভ্রমণের নতুন অর্থ: মানুষ, সংস্কৃতি ও অনুভূতির আবিষ্কার
ভ্রমণ মানে কি শুধু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়া? লে ভোয়াজ দ্য রেজে সেই প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে ভ্রমণকে দেখেছে মানুষ, সংস্কৃতি, ভাষা, অনুভূতি ও গল্প আবিষ্কারের একটি প্রক্রিয়া হিসেবে। এই শিল্পযাত্রায় প্রতিটি সুর, প্রতিটি রেখা এবং প্রতিটি দৃশ্য যেন একেকটি নতুন পরিচয়ের দরজা খুলে দেয়।
১৩ অক্টোবর ঢাকার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে অনুষ্ঠিত এই আনন্দময় পরিবেশনা শিল্পের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক সীমানা অতিক্রম করার এক তাৎপর্যপূর্ণ অভিজ্ঞতা উপহার দিয়েছে। EFID শিক্ষার্থীদের উৎসাহপূর্ণ অংশগ্রহণ, দর্শকদের সক্রিয় সম্পৃক্ততা এবং পরিবেশনা-পরবর্তী প্রাণবন্ত মতবিনিময় সন্ধ্যাটিকে পরিণত করেছে এক আন্তরিক সাংস্কৃতিক মিলনমেলায়।
অ্যালিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকা ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের যৌথ উদ্যোগে উপস্থাপিত লে ভোয়াজ দ্য রেজে তাই একটি সফল শিল্পানুষ্ঠানের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক বিনিময়ের গুরুত্বও স্মরণ করিয়ে দেয়। সঙ্গীত, অঙ্কন, আলোকচিত্র ও ভিডিওর সম্মিলিত ভাষায় এটি তুলে ধরেছে এমন এক মানবিক দর্শন, যেখানে শিল্প মানুষকে নতুন করে চিনতে শেখায়, সংস্কৃতিকে কাছ থেকে অনুভব করতে সাহায্য করে এবং ভৌগোলিক সীমারেখার বাইরেও সংযোগের সম্ভাবনা তৈরি করে।
এই শিল্পযাত্রার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো—শিল্পের ভাষায় মানুষকে মানুষের কাছে নিয়ে আসা। কারণ, সুরের যেমন কোনো একক সীমান্ত নেই, তেমনি মানুষের গল্প, অনুভূতি ও সৃজনশীলতারও কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানা নেই।
আফনান হাকিম