
ঢাকার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক অনন্য চলচ্চিত্র সন্ধ্যার সাক্ষী থাকল Alliance Française de Dhaka। ২ মে ২০২৬ তারিখে এখানে প্রদর্শিত হয় আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র Les Fleurs du Manguier – Lost Land (২০২৫)—জাপানি নির্মাতা Akio Fujimoto-এর পরিচালনায় নির্মিত এক হৃদয়স্পর্শী কাহিনি, যা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জীবনের গভীর বাস্তবতাকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরেছে।
জাপান, ফ্রান্স, জার্মানি ও মালয়েশিয়ার যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত ১৩৮ মিনিটের এই চলচ্চিত্রটি ৮২তম Venice International Film Festival-এ ‘স্পেশাল অরিজোন্তি জুরি পুরস্কার’ অর্জন করে ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
গল্পের কেন্দ্রে দুই শিশু, এক অনিশ্চিত যাত্রা
চলচ্চিত্রটি আবর্তিত হয়েছে দুই রোহিঙ্গা ভাইবোন—চার বছরের শাফি ও নয় বছরের সোমিরার চোখে দেখা এক ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রাকে ঘিরে। বাংলাদেশের একটি শরণার্থী শিবির ছেড়ে তারা মালয়েশিয়ায় পরিবারের সন্ধানে পাড়ি জমায়—যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপ অনিশ্চয়তা ও বিপদের ছায়ায় আচ্ছন্ন।
রোহিঙ্গা ভাষায় নির্মিত এই ছবিতে ফরাসি ও ইংরেজি সাবটাইটেল যুক্ত থাকায় আন্তর্জাতিক দর্শকদের জন্যও এটি সহজবোধ্য ও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে।
বাস্তুচ্যুতি, মানবতা ও বিশ্ববাসীর দায়
Lost Land শুধু একটি চলচ্চিত্র নয়—এটি এক মানবিক দলিল। বাস্তুচ্যুত মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে যে বৈশ্বিক প্রশ্নগুলো আজও অমীমাংসিত, সেগুলোকে সংবেদনশীলভাবে তুলে ধরেছে এই কাজটি। চলচ্চিত্রটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিয়মিত অভিবাসনের পেছনের বাস্তবতাগুলো প্রতিরোধ করা এবং নিরাপদ জীবিকার পথ তৈরি করা কতটা জরুরি।

প্রদর্শনী-পরবর্তী প্রাণবন্ত আলোচনা
অডিটোরিয়াম নুভেল ভগে অনুষ্ঠিত এই প্রদর্শনী শেষে দর্শকদের অংশগ্রহণে এক প্রাণবন্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। রোহিঙ্গা সংকটের বর্তমান প্রেক্ষাপট, মানবিক চ্যালেঞ্জ এবং চলচ্চিত্রটির আন্তর্জাতিক সম্ভাবনা নিয়ে সেখানে মতবিনিময় হয়।
এই আয়োজনে সহযোগিতা করে UNHCR, Alliance Française de Dhaka এবং Embassy of France in Bangladesh—যা এ ধরনের মানবিক ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগের গুরুত্বকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরে।
নির্মাতা পরিচিতি
পরিচালক Akio Fujimoto দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অভিবাসী জীবনের গল্প নিয়ে কাজ করার জন্য সুপরিচিত। তাঁর পূর্ববর্তী চলচ্চিত্র Passage of Life (২০১৭) এবং Along the Sea (২০২০) বাস্তুচ্যুতি ও মানবাধিকারের বিষয়গুলোকে গভীর সংবেদনশীলতায় উপস্থাপন করে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হয়েছে। তাঁর কাজ প্রায়ই কল্পকাহিনি ও প্রামাণ্য ধারার সীমানা ভেঙে প্রান্তিক মানুষের জীবনের সত্যকে তুলে ধরে।
‘Lost Land’ ঢাকায় শুধু একটি চলচ্চিত্র প্রদর্শনী নয়—এটি ছিল মানবতার প্রতি এক জাগরণ, যেখানে শিল্প হয়ে উঠেছে প্রতিবাদের ভাষা, আর গল্প হয়ে উঠেছে বিশ্ববাসীর বিবেকের দর্পণ।
ভ্রমণডেস্ক