
মানব ইতিহাসে মহাকাশ জয়ের যে অভিযাত্রা নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল, তার অগ্রদূত ইউরি গ্যাগারিনকে সম্মান জানাতে ১২ এপ্রিল ২০২৬ ঢাকার জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘর (NMST)-এ উন্মোচিত হলো তার আবক্ষ মূর্তি। আন্তর্জাতিক মানব মহাকাশযাত্রা দিবস ও গ্যাগারিনের ঐতিহাসিক মহাকাশযাত্রার ৬৫তম বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এই অনুষ্ঠান যেন স্মরণ করিয়ে দিল—মানুষের স্বপ্নের কোনো সীমানা নেই।
বাংলাদেশে রাশিয়ান ফেডারেশনের দূতাবাস, রাশিয়ান ফ্রেন্ডশিপ সোসাইটি উইথ বাংলাদেশ এবং ঢাকাস্থ রাশিয়ান হাউসের যৌথ উদ্যোগে, জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরের সহযোগিতায় এই আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৬১ সালের ১২ এপ্রিল গ্যাগারিনের মহাকাশযাত্রা শুধু একটি বৈজ্ঞানিক সাফল্যই নয়, বরং মানবজাতির জন্য মহাবিশ্বের দ্বার উন্মোচনের এক ঐতিহাসিক মাইলফলক—যার প্রতিধ্বনি আজও অনুপ্রেরণা জোগায়।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন ঢাকাস্থ রাশিয়ান হাউসের পরিচালক মিস আলেকজান্দ্রা খ্লেভনয়। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, মহাকাশ অনুসন্ধান এক অনন্য “সেতুবন্ধন”, যা ভাষা ও ভৌগোলিক সীমা অতিক্রম করে বিশ্বমানবতাকে একসূত্রে গাঁথে। এই স্মারকটি বাংলাদেশ ও রাশিয়ার বন্ধুত্বের এক স্থায়ী প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার খোজিন। তিনি গ্যাগারিনের সাহসিকতা ও তার অভিযানের বৈশ্বিক গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “এই মহাকাশযাত্রা ছিল সমগ্র মানবজাতির অর্জন।” একইসঙ্গে তিনি উন্নয়নশীল দেশগুলোর মহাকাশ গবেষণায় রাশিয়ার সহযোগিতার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন এবং আশাবাদ ব্যক্ত করেন—একদিন কোনো বাংলাদেশিও মহাকাশে পাড়ি জমাবে।

রাশিয়ান ফ্রেন্ডশিপ সোসাইটি উইথ বাংলাদেশের সভাপতি ও মূর্তিটির পৃষ্ঠপোষক জনাব সাত্তার মিয়া এই উদ্যোগকে বিজ্ঞান ও শিক্ষাক্ষেত্রে দুই দেশের ক্রমবর্ধমান অংশীদারিত্বের প্রতীক হিসেবে আখ্যায়িত করেন। NMST-এর মহাপরিচালক মিসেস মুনিরা সুলতানা এবং বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মশহুরুল আমিনও তরুণ প্রজন্মের জন্য এই প্রদর্শনীর অনুপ্রেরণামূলক তাৎপর্যের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল রাশিয়ায় জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী মিস এ. লাহেরির বক্তব্য। তিনি ভবিষ্যতে দেশের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন—যা উপস্থিত তরুণদের মাঝে নতুন স্বপ্নের সঞ্চার করে।

উন্মোচন পর্বের পর অনুষ্ঠিত হয় এক মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, যেখানে রাশিয়ান দূতাবাস স্কুলের শিক্ষার্থীরা পরিবেশন করে বৈজ্ঞানিক উপস্থাপনা, ইংরেজি কবিতা আবৃত্তি এবং রুশ মহাকাশচারীদের জনপ্রিয় সংগীত “ত্রাভা ই দুমা” (Grass Near the House)।
অনুষ্ঠানের সমাপনী পর্বে ছিল মহাকাশ বিষয়ক চিত্র প্রদর্শনী—যেখানে রাশিয়ান ও বাংলাদেশি শিশুদের আঁকা ছবিতে ফুটে ওঠে মহাকাশের স্বপ্ন ও কল্পনা। এছাড়াও অংশগ্রহণকারীদের মাঝে “Forever First” টি-শার্ট ও স্মারক উপহার বিতরণ করা হয় এবং ত্সিওলকভস্কি আন্তর্জাতিক মহাকাশ চলচ্চিত্র উৎসবের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়।
ঢাকার জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরে ইউরি গ্যাগারিনের এই আবক্ষ মূর্তি শুধু একটি ভাস্কর্য নয়—এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক অনুপ্রেরণার আলোকবর্তিকা। এটি স্মরণ করিয়ে দেয়, আকাশের ওপারেও মানুষের স্বপ্নের বিস্তার—আর সেই স্বপ্ন একদিন বাংলাদেশের তরুণদের হাত ধরেই ছুঁয়ে ফেলতে পারে নক্ষত্রলোক।
ভ্রমণডেস্ক