
বাংলা নববর্ষ মানেই রঙিন আবেগ, প্রাণের উচ্ছ্বাস আর শিকড়ের টান। আর সেই উৎসব যখন ছড়িয়ে পড়ে নদীর বুক জুড়ে, তখন তা হয়ে ওঠে আরও ব্যতিক্রমী ও স্মরণীয়। এবারের পহেলা বৈশাখে তেমনই এক অনন্য অভিজ্ঞতার সাক্ষী হয়েছে শতবর্ষী প্যাডেল স্টিমার পিএস মাহসুদ, যেখানে দিনভর চলেছে বাঙালিয়ানার এক বর্ণিল আয়োজন।
মঙ্গলবার ১৪ এপ্রিল সকাল সাড়ে ১১টার দিকে ঢাকার সদরঘাট থেকে যাত্রা শুরু করে ঐতিহ্যবাহী এই স্টিমার। বিশাল প্যাডেলের ছন্দে নদীর বুকে এগিয়ে চলা স্টিমারটি যেন যাত্রীদের ফিরিয়ে নেয় এক নস্টালজিক অতীতে—যখন নদীপথই ছিল ভ্রমণের প্রধান ভরসা। একসময় নদীপথের রাজা হিসেবে পরিচিত এই স্টিমার আজও বহন করে সেই ঐতিহ্যের স্মারক, আর তার সঙ্গে যুক্ত হয় বৈশাখের প্রাণবন্ত রঙ।
স্টিমারজুড়ে ছিল বৈশাখী সাজসজ্জার অপূর্ব সমাহার—বাঘ, সিংহ, ঘুড়ি আর নানান রঙিন লোকজ মোটিফে সেজে উঠেছিল পুরো ডেক। এই সাজসজ্জা শুধু দৃষ্টিনন্দনই নয়, বরং বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতিরই প্রতিচ্ছবি। যাত্রার শুরুতেই পরিবেশন করা হয় ঐতিহ্যবাহী সকালের নাস্তা—তাজা ফল ও বিভিন্ন ধরনের পিঠা, যা উৎসবের আবহকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
এরপর স্টিমারটি চাঁদপুরের পথে এগিয়ে যায়। তিন নদীর মোহনায় নোঙর করে আয়োজন করা হয় মধ্যাহ্নভোজের। দুপুরের মেনুতে ছিল বাঙালির চিরচেনা স্বাদ—ইলিশ ভাজা, পান্তা ভাত, গরম ভাত, আলু ভর্তা, ডাল, মাংসসহ নানা রকম ভর্তা আর শেষপাতে দই। নদীর মৃদু হাওয়ায় বসে এমন ভোজ যেন গ্রামবাংলার চিরচেনা আবহকে ফিরিয়ে আনে—যা শুধু রসনাই তৃপ্ত করে না, মনে গেঁথে দেয় এক গভীর অনুভূতি।

খাবারের পাশাপাশি পুরো যাত্রাজুড়ে ছিল প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক আয়োজন। বিভিন্ন শিল্পীর কণ্ঠে বাঙালিয়ানা গান ও জনপ্রিয় সঙ্গীত পরিবেশনায় স্টিমারের ডেক রূপ নেয় এক ভাসমান মঞ্চে। বিকেলে যাত্রীদের জন্য ছিল মোয়া, বাতাসাসহ গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী নাস্তা, যা উৎসবের আমেজকে আরও পূর্ণতা দেয়।
শুধু খাবার আর গানেই সীমাবদ্ধ ছিল না আয়োজন। মেহেদি আঁকার স্টল, শিশু ও বড়দের জন্য লুডু ও ক্যারাম বোর্ডের মতো খেলাধুলার ব্যবস্থা পুরো পরিবেশকে করে তোলে প্রাণচঞ্চল ও পরিবারবান্ধব।
এই ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতা নিয়ে ভ্রমণকারীদের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। এক যাত্রী জানান, পিএস মাহসুদে ভ্রমণ মানেই শুধু যাত্রা নয়—এটি ইতিহাসের সঙ্গে এক গভীর সংযোগ। স্টিমারের প্রতিটি কোণেই লুকিয়ে আছে অতীতের গল্প, আর নদীর মাঝে বসে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার অভিজ্ঞতা যেন গ্রামের বাড়িতে বৈশাখ উদযাপনেরই অন্যরকম রূপ।
স্টিমারের আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ ছিল এর অভ্যন্তরে থাকা ছোট্ট যাদুঘর। এখানে সংরক্ষিত রয়েছে পুরনো নৌ-যন্ত্রাংশ, ঐতিহাসিক ছবি ও গুরুত্বপূর্ণ দলিল, যা দেশের নদীপথের সমৃদ্ধ অতীতকে নতুন করে চিনতে সাহায্য করে।
দিনব্যাপী এই ভাসমান উৎসবের সমাপ্তি ঘটে বিকেল ৬টার দিকে সদরঘাটে ফিরে আসার মাধ্যমে। তবে যাত্রীদের মনে থেকে যায় এক অন্যরকম বৈশাখের স্মৃতি—যেখানে নদী, ঐতিহ্য আর আনন্দ মিলেমিশে তৈরি করেছে এক অনন্য অভিজ্ঞতার গল্প।
ভ্রমণডেস্ক