তান শ্রী প্রফেসর ড. গাউস জসমান: মালয়েশিয়ার উচ্চশিক্ষার কিংবদন্তি রূপকারের সান্নিধ্যে..

আবু সুফিয়ান

সম্পাদক ও প্রকাশক, ট্রাভেল ম্যাগাজিন ভ্রমণ

জীবনে কিছু কিছু সাক্ষাৎ শুধু একটি সাক্ষাৎ নয়।
কিছু মানুষ শুধু একজন ব্যক্তি নন।
তাঁরা একটি ইতিহাস। একটি প্রতিষ্ঠান। একটি অনুপ্রেরণা।

সম্প্রতি আমার জন্য তেমনই এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা ছিল মালয়েশিয়ার কিংবদন্তি শিক্ষানায়ক তান শ্রী প্রফেসর ড. গাউস জসমান-এর সঙ্গে দীর্ঘ প্রায় দুই ঘণ্টার এক উষ্ণ, আন্তরিক ও হৃদয়ছোঁয়া বৈঠক।

আজ বিশ্বের হাজার হাজার শিক্ষার্থী মালয়েশিয়ায় পড়তে আসেন। মালয়েশিয়া আজ আন্তর্জাতিক শিক্ষার অন্যতম শক্তিশালী গন্তব্য। কিন্তু এই অবস্থানে দেশটি একদিনে পৌঁছায়নি। এর পেছনে রয়েছে কিছু দূরদর্শী মানুষের স্বপ্ন, সাহস, পরিকল্পনা এবং নিরলস পরিশ্রম। সেই মানুষদের অন্যতম হচ্ছেন তান শ্রী ড. গাউস জসমান।

তিনি মালয়েশিয়ার প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মাল্টিমিডিয়া ইউনিভার্সিটি (MMU)-এর প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট। পরে ইউনিভার্সিটি মালয়ার ভাইস-চ্যান্সেলর হিসেবে এমন এক নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যার ফলে প্রথমবারের মতো ইউনিভার্সিটি মালয়া বিশ্বের শীর্ষ ২০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় স্থান করে নেয়। তিনি শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করেননি। তিনি একটি জাতির উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেছেন।

গবেষণা, উদ্ভাবন, আন্তর্জাতিকীকরণ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, একাডেমিক উৎকর্ষ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর অবদান আজ মালয়েশিয়ার শিক্ষা ইতিহাসের অংশ।

আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাংকিংয়ে মালয়েশিয়ার অবস্থান শক্তিশালী করা এবং বিশ্বব্যাপী মালয়েশিয়ার উচ্চশিক্ষার সুনাম বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে তাঁর অনন্য অবদানের জন্য। তান শ্রী ড. গাউস জসমানকে মালয়েশিয়ার উচ্চশিক্ষার আধুনিক রূপান্তরের অন্যতম প্রধান স্থপতি হিসেবে গণ্য করা হয়। তাঁর নেতৃত্ব, দূরদর্শিতা এবং একাডেমিক অবদান শুধু মালয়েশিয়াতেই নয়, আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষা অঙ্গনেও গভীরভাবে সমাদৃত।

ইউনিভার্সিটি মালয়ার ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড স্টাডিজ-এ এই মহান ব্যক্তিত্বের আন্তরিকতা, অন্তর ছুয়ে যাওয়া বিনয়, অপরের প্রতি সম্মান প্রদর্শন সবমিলিয়ে প্রায় দুই ঘন্টার বৈঠকে আমরা মালয়েশিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থা, বৈশ্বিক উচ্চশিক্ষার বর্তমান ধারা, সমসাময়িক বিশ্ব পরিস্থিতি, সংস্কৃতি এবং শিক্ষা-গবেষণার ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর মূল্যবান অভিজ্ঞতা ও চিন্তাধারা আমাদের সঙ্গে ভাগ করে নেন।

কোনো আনুষ্ঠানিকতার দেয়াল নয়। ছিল আন্তরিকতা। ছিল হাসিমুখ। ছিল মন খুলে কথা বলার পরিবেশ।

প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী আমাদের আলোচনায় উঠে আসে মালয়েশিয়ার উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা, বৈশ্বিক উচ্চশিক্ষার পরিবর্তিত বাস্তবতা, গবেষণা ও উদ্ভাবন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সংস্কৃতি, ভবিষ্যতের দক্ষ মানবসম্পদ গঠন এবং বাংলাদেশ–মালয়েশার শিক্ষা সহযোগিতার নতুন দিগন্ত।

আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে ছিল—দুই দেশের মধ্যে উচ্চশিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, গবেষণা, জ্ঞান বিনিময় এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে কীভাবে আরও কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা যায়। তিনি ব্যাখ্যা করেন, কীভাবে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার শিক্ষার্থী, গবেষক এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে আরও বেশি উপকৃত হতে পারে এবং যৌথ উদ্যোগের মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতে নতুন নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত হতে পারে।

দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি অত্যন্ত আন্তরিকভাবে তাঁর মূল্যবান চিন্তা ও দিকনির্দেশনা আমাদের সঙ্গে ভাগ করে নেন। বিশেষ করে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা কীভাবে মালয়েশিয়ার উচ্চশিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারে, সে বিষয়ে তিনি বাস্তবসম্মত ও দূরদর্শী পরামর্শ প্রদান করেন।

একইসঙ্গে তিনি দৃঢ় বিশ্বাস ব্যক্ত করেন যে, বাংলাদেশের মেধা, উদ্ভাবনী সক্ষমতা এবং বিপুল মানবসম্পদও মালয়েশিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। তাঁর মতে, পারস্পরিক আস্থা, জ্ঞান বিনিময় এবং যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার শিক্ষা সম্পর্ক আরও শক্তিশালী ও ফলপ্রসূ হয়ে উঠতে পারে।

এমন চিন্তা একজন সত্যিকারের বিশ্বনাগরিকের পক্ষেই সম্ভব।

এই স্মরণীয় বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ প্রফেসর ড. থমাস লিয়ং, সিইও ও প্রিন্সিপাল, জেনোভাসি সেন্টার ফর হায়ার লার্নিং (Genovasi Center for Higher Learning) এবং কেএল এভিয়েশন একাডেমি (KL Aviation Academy)-এর প্রতিষ্ঠাতা ড. আল ফাইজাল। আলোচনা শেষ হলেও সম্পর্কের শুরু হলো সেদিনই। আলহামদুলিল্লাহ।

মালয়েশিয়ায় আমার পিএইচডিকালে এমন একজন বিশ্ববরেণ্য শিক্ষানায়কের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটানো, তাঁর কাছ থেকে শেখার সুযোগ পাওয়া এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সম্ভাবনা সৃষ্টি হওয়া—এটি নিঃসন্দেহে জীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি। আমি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই তান শ্রী প্রফেসর ড. গাউস জসমান মহোদয়কে। বিশেষ ধন্যবাদ জানাই প্রফেসর ড. থমাস লিয়ং-কে, যিনি এই অসাধারণ সাক্ষাতের পুরো আয়োজনটি করেছেন। কৃতজ্ঞতা জানাই ড. আল ফাইজাল-কেও, যাঁর আন্তরিক সহযোগিতা এই বৈঠককে আরও অর্থবহ করে তুলেছে।

জ্ঞান ভাগ করলে কমে না—বরং বাড়ে।

আর সত্যিকারের মহান মানুষদের একটি বড় পরিচয় হলো—তাঁরা তাঁদের অর্জনের চেয়ে তাঁদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে বেশি ভালোবাসেন। তান শ্রী প্রফেসর ড. গাউস জসমান সেই বিরল মানুষদের একজন।

ইনশাআল্লাহ, এই পরিচয়, এই শিক্ষা এবং এই সম্পর্ক ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার শিক্ষা, গবেষণা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে।

গভীর শ্রদ্ধা, আন্তরিক কৃতজ্ঞতা এবং অফুরন্ত শুভকামনা এই মহান শিক্ষানায়কের প্রতি।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »
error: Content is protected !!