হুমায়ূন আহমেদ স্মৃতি-১
আবু সুফিয়ান

বাংলা সাহিত্য-ইতিহাসের জনপ্রিয়তম লেখক, নাট্যকার, চলচ্চিত্র নির্মাতা, গীতিকার হুমায়ূন আহমেদের ৭৭তম জন্মদিন আজ ১৩ নভেম্বর। কালজয়ী এই লেখকের স্মরণে এই স্মৃতিচারণমূলক লেখাটি মুদ্রিত হলো। উল্লেখ্য, ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জে মাতামহের বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন হুমায়ূন আহমেদ।
স্ত্রীর সাথে স্বামীর ঝগড়া হয়। হবে। আমারও হয়। তবে আমাদের ঝগড়াগুলো একটু আলাদা। ঝগড়াজাতীয় বিষয়গুলোতে সাধারণত বিদ্বেষ বা ঘৃনা-র একটা ব্যাপার থাকে। আমাদের ঝগড়ার ঘটনাগুলো লন্ডন-প্যারিস-সিডনি-স্পেনের বইসহ বহু লেখায় লিখেছি। সেই কাহিনী পড়ে না-কি লোকে বিনোদন পেয়েছে। কেউ কেউ উৎসাহিত হয়ে বলেছেন, আরো ঝগড়া করেন। আরো ঝগড়া করেন..। ভাবীকে আরো বেশি বেশি ঝগড়া করতে বলেন। আমরা উপকৃত হবো।
২০১০ সালে যখন জীবনযাপনে বসুলুল্লাহ স. এর বাণী বইয়ের কাজটা করছি, তখন সাবৃনার সাথে একটা নতুন ঝগড়া শুরু হলো। আগের ঝগড়াগুলোতে দুজনের কথা চালাচালি, কথা কাটাকাটি, কথার ফাটাফাটি থাকতো। তীব্র এবং তীর্যক বাক্যবাণ চলতো। সাধারণত সে বলে বেশি, আমি শ্রোতা। এইবার ঘটনা ঘটলো উল্টো। ঝগড়া লাগলে সে কথা বলেনা। আমি কথা বললে কানে আঙ্গুল চেপে চোখ বুজে থাকে।
ঝগড়ার এই নমুনাটা একদমই নতুন। জিজ্ঞেস করলাম বিষয় কী?
সে জবাব দেয় না। কানে আঙ্গুল দিয়ে জবান আটকে রাখে।
জবাব বের করার জন্য আবার প্রশ্ন করলাম, চিন্তা ভাবনা কি বেশি শুরু করেছো না-কি? শারীরিক শ্রমে শরীরে ঘাম হয়, যারা চিন্তা বেশি করে, তাদের ব্রেইনে ঘাম হয়। ব্রেইনের ঘাম কানে এসে জমা হয়। লোকে তাকে কানের ময়লা বলে। তখন কানের ভেতর চুলকায়। কানে আঙ্গুল দিলে আরাম হয়। তোমার কী সেরকম কিছু কি হয়েছে? কানে আঙ্গুল চেপে ধরে আছো কেনো?
প্রশ্নের তরিকা যথার্থ হয়েছে। সে কান থেকে আঙ্গুল নামিয়ে বললো, তোমার কথা আমার শুনতে ইচ্ছা হচ্ছেনা। জ্বালা লাগছে, অসহ্য!
জ্বালা লাগবে কেনো? কুশ্রি হওয়া সত্ত্বেও আমাকে তো কথার জন্যই বিয়ে করেছো? এখন আবার কার কথা শুনতে ইচ্ছা হলো?
সে জবাব দিলো, হুমায়ুন আহমেদের কথা। উনার কথাই শুধু মিঠা লাগে। তোমার কথা তিতা। অসহ্য!
আমি বললাম, তাহলে বিকেলে চলো হুমায়ুন ভাইয়ের বাসায় যাই। উনি হলেন কথার রাজা। উনার মিঠা কথা শুনে আসি।

হুমায়ূন আহমেদ আমার জীবনে খুবই তাৎপর্যময়। আমার লেখা হুমায়ূন আহমেদের মতো এই ধারণা থেকে আনিস ভাই (লেখক ও প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আনিসুল হক) আমাকে ভোরের কাগজ এবং প্রথম আলোতে আধঘন্টা এবং পৌনেএকঘন্টা নামে কলাম লেখালেন। নওয়াজীশ ভাই (বহুব্রিহী, অয়োময়সহ বহু বিখ্যাত নাটকের পরিচালক, যিনি হুমায়ূন ভাইকেও নাটক জগতে এনেছিলেন) আমার একটা স্ক্রীপ্ট পড়ে বললেন হুমায়ূনের পরে কোনো নাটকের স্ক্রীপ্ট আমার ভালো লাগতো না। বহুদিন পরে তোমার নাটকের স্ক্রীপ্ট আমাকে মুগ্ধ করেছে, তোমার লেখায় হুমায়ূন আহমেদ আছে। তুমি নাটক করো। হুমায়ূন আহমেদেরে দৃষ্টান্ত দিয়ে উনার উৎসাহেই নাট্যকার থেকে আবার নাট্যনির্দেশক হওয়া।
আমার স্ত্রী সাবৃনা এমনই হুমায়ূনভক্ত যে সম্ভব হলে সে হুমায়ূন আহমেদকে বিয়ে করতো। একথা পরে হুমায়ূন ভাইকেও বলেছে। যেহেতু সেটা সম্ভব না, তাই হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখে এমন একজনকে পাওয়াতে তাকেই বিয়ে করেছে-সে কুশ্রি..গরিব..লেদু যাই হোক..।
হুমায়ূন ভাই অনেককেই আড্ডায় ডাকতেন। আমাকে কখনো আড্ডায় ডাকেননি। উনার সাথে যত দেখা সাক্ষাৎ হয়েছে আমার বা আমাদের দুজনের, তার প্রায় সবগুলো সময়েই উনি ছিলেন একা। এত মনযোগ দিয়ে কথা বলতেন, কথা শুনতেন- মনে হতো আহারে এমন বিনয়ী, এমন আপন মানুষ আর হয় না।
হুমায়ূন ভাইয়ের দখিণ হাওয়া বাসার ড্রইংরুমের ইন্টেরিয়র করেছেন শাওন আপা। একটু আধার আধার লাইটিং। সেখানে একটা ডাবল সোফায় বসতাম। হুমায়ূন ভাই একটা বেতের চেয়ার টেনে এনে মুখোমুখি বসতেন। বলতেন- নবীজী কখনো ঘাড় ঘুরিয়ে বা কাত করে কারো সাথে কথা বলেননি। সোজাসুজি শ্রোতার দিকে তাকিয়ে কথা বলতেন। ফুল এটেনশন দিতেন। এটা ছিলো উনার উৎকৃষ্ট বিনয়ের প্রকাশ। আমি নবীজীর এটা ফলো করার চেষ্টা করি।
ফিরে আসার সময় হুমায়ূন ভাই প্রায় সব সময়ই কিছু না কিছু উপহার দিতেন। তার মধ্যে বই-ই সবচেয়ে বেশি। বিদায়কালে লিফট পর্যন্ত এগিয়ে দিতেন। লিফটের দরজা বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকতেন। আমি খুব শরমিন্দা হতাম। এত বড় মানুষ, এতবড় লেখক আমার মতো তুচ্ছ, অযোগ্য এবং অধম মানুষকে এত ভালোবাসা এবং স্নেহময় সম্মান দিচ্ছেন- বড় অস্বস্তি লাগতো। একদিন বিদায়কালে বলেই ফেললাম, হুমায়ূন ভাই আপনি আর লিফটের কাছে আসার দরকার নেই। আমি যেতে পারবো।
হুমায়ূন ভাই নরম গলায় বললেন, তুমি আমাকে নবীজীর সুন্নত পালন করতে বারণ করছো আবু সুফিয়ান?
এরপর কখনো আর বলিনি।

হুমায়ূন আহমেদের মিঠা কথা শোনার জন্য সাবরিনাকে নিয়ে বিকেলবেলা গেলাম কথার রাজার বাসায়। যথারীতি আগের ভঙ্গিতে বসলাম। হুমায়ূন ভাইয়ের পরনে পাঞ্জাবি-লুঙ্গি। উনি বেতের সিঙ্গেল চেয়ার টেনে মুখোমুখি বসলেন। খোঁজখবর নিচ্ছেন। নানা বিষয়ে কথা বলছেন। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার জীবনযাপনে রসুলুল্লাহ্ স. এর বাণী কখন বেরুচ্ছে? আমি আগ্রহের সাথে অপেক্ষা করছি সেটি পড়তে।
শীঘ্রই বের হবে। কাজ প্রায় শেষ করে এসেছি।
খুব ভালো কাজ করছো। তবে আমার কি মনে হয় জানো- আমার স্থান হবে দোজখে।
আমি বললাম, এটা হতেই পারেনা হুমায়ূন ভাই। আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন। চাইলেও আপনার দোজখে যাওয়া কঠিন। এটা আমার মনমতলবি কথা না। আল্লাহর রসুল স. একটা চমৎকার ডিরেকশন দিয়ে গেছেন। নবীজী বলছেন, মানুষের জীবনের শ্রেষ্ঠ পুণ্য কর্ম হচ্ছে ৫টি। তার প্রথমটি হলো কেউ যদি কারো মনকে ভালো করে দেয়। আমার মন খারাপ থাকলে সঞ্জীব চৌধুরীর গান শুনি, কেউ রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি করে। আমার স্ত্রীর মন খারাপ থাকলে আপনার বই পড়ে। প’ড়ে একা একাই হাসে। তার খারাপমন ভালো হয়ে যায়। এরকম আরো হাজার হাজার মানুষের মনখারাপ ভালো হয়ে যায় আপনার লেখা পড়ে। আপনার সাথে যোগাযোগ করতে পেরে। আপনার কথা শুনে। সুতরাং রসুলের বাণী অনুযায়ী পৃথিবীর সেরা পুণ্যকর্মটি আপনি করছেন। শুধু যে করছেন, তা না, সেটা আবার বহুগুণে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আপনার বই পড়ে যার মন ভালো হলো, মন ভালো হওয়ার কারণে সে অন্যদের সাথে ভালো আচরণ করলো, ভালোভাবে কথা বললো, এমনকি সুখকর নিদ্রায় মগ্ন হলো (নিদ্রাও পুণ্যকর্ম); অথবা তার কারণে আবার অন্য কারো মনও ভালো হতে পারে, মন ভালো থাকায় তার কোনো সিদ্ধান্তে কারো উপকারও হতে পারে; অর্থাৎ যা কিছুই ভালো হোক, যার জন্যই হোক, এই সবগুলোই পুণ্যকর্ম বা ভালো কাজ বা নেক আমল। রসুল ক্লিয়ার জানিয়ে দিয়েছেন, প্রতিটি শুভ কাজের সূচনাকারি, পরবর্তিতে সেই কাজের অনুসরণকারী, সেখান থেকে সুফলভোগকারি . . . তা থেকে সুফলভোগকারি . . . সেখান থেকে . . . . এভাবে যত সময় পর্যন্ত যতভাবে চলতে থাকবে, এই সমস্ত সুকর্ম বা নেক আমলের পুণ্য প্রথমজন একইভাবে সমান পরিমাণে পেতে থাকবে। রবীন্দ্রনাথ তার কাব্য দিয়ে বা সঞ্জীব চৌধুরী তার গান দিয়ে, ভালো কথক তার কথা দিয়ে বা আপনি আপনার লেখা দিয়ে কত শত-শহস্র-অযুত-নিযুত-পুণ্যকর্ম বা নেক আমলের সোয়াব পাচ্ছেন তার হিসাব কি আপনার আছে হুমায়ূন ভাই?
বেহেশত লাভ করবার এবং দোজখ থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র পুঁজি, অদ্বিতীয় সম্পদ হচ্ছে পৃথিবীতে পুণ্যকর্ম করা, নেক আমল করা। সুতরাং চাইলেও আপনার দোজখে যাওয়ার স্কোপ খুবই কম হুমায়ূন ভাই।
হুমায়ূন ভাই বললেন, তোমার বইটা তাড়াতাড়ি বের করো। এই কথাগুলো মাইকে প্রচার করো। মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দাও। বেশিবেশি বলো।
(আগ্রহী পাঠক নিচের লিঙ্ক থেকে বইটি ডাউনলোড করে নিতে পারেন: https://drive.google.com/file/d/1-rKtMT96SOD3oLaGf-OW1boyaApFWW7Y/view?usp=sharing)
আমরা আরো বেশ খানিকক্ষণ গল্প করলাম।
মাগরিবের আজান হচ্ছে। হুমায়ূন ভাইয়ের সাথে আমার বৈকালিক গল্পের টাইম মাগরিবের আগ পর্যন্ত। এর পরে অন্য গ্রুপ আসে।
আমরা চা খাচ্ছি। হুমায়ূন ভাই ভেতর থেকে উপহার নিয়ে এলেন-দুইটা বই। মাতাল হাওয়া ও রাক্ষস, খোক্কস এবং ভোক্কস।
সাবৃনা বললো, আমাকে মাতাল হাওয়া দিয়েন স্যার।
হুমায়ূন ভাই বইতে লিখলেন,
সাবৃনা
নিশ্চয়ই তোমার আশা পূর্ণ হবে।
হুমায়ূন আহমেদ
১-৩-২০১০

আমাকে দিলেন রাক্ষস, খোক্কস এবং ভোক্কস। বইটা হাতে নিয়ে সাবৃনার দিকে তাকালাম। আমার কথা তার অসহ্য লাগে। শুনতে ইচ্ছা করেনা। হুমায়ূন আহমেদের কথা শুধু শুনতে ইচ্ছা করে। কথার রাজা হুমায়ূন ভাই আমার জন্য কি লিখেছেন সেটা দেখার জন্য বইটা হাতে নিলো সে। আমি বললাম পড়ো।
হুমায়ূন ভাই লিখেছেন,
আবু সুফিয়ান
তুমি ভালো থেকো
তোমার সঙ্গে কথা বলা আনন্দময়
হুমায়ূন আহমেদ
১-৩-২০১০
পরিচিতি: লেখক, নাট্যকার, টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাতা, শিক্ষক ও গবেষক এবং সম্পাদক, ভ্রমণ ম্যাগাজিন