আলো-ছায়ায় কবিতার পুনর্জন্ম; আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকায় নাসির আলী মামুনের ৬৬তম একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী

আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকা আয়োজন করেছে প্রখ্যাত আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুনের ৬৬তম একক প্রদর্শনী “ফটোসিয়াম: লাইফ অব পোয়েট্রি”। ৩ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে লা গ্যালারিতে উদ্বোধন হওয়া এই প্রদর্শনী চলবে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত।

বাংলা কবিতার দুই মহীরুহ—শামসুর রাহমান (১৯২৯–২০০৬) এবং আল মাহমুদ (১৯৩৬–২০১৯)—কে কেন্দ্র করে নির্মিত এই প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে সাদা-কালো প্রতিকৃতি, স্মৃতি ও আর্কাইভাল উপাদানের এক দুর্লভ সমাহার। আলোকচিত্রের দ্বিশতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এই প্রদর্শনী শিল্প, সাহিত্য ও ইতিহাসকে এক অভূতপূর্ব সংলাপে যুক্ত করেছে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রথম আলোর সম্পাদক ও প্রকাশক মতিউর রহমান, বাংলাদেশে নিযুক্ত ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যাঁ-মার্ক সেরে-শারলে এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পী মনিরুল ইসলাম। তাঁদের উপস্থিতি এই আয়োজনকে আরও তাৎপর্যময় করে তোলে।

ফরাসি রাষ্ট্রদূত তাঁর বক্তব্যে বলেন, এই প্রদর্শনী ফটোগ্রাফি, কবিতা ও ইতিহাসকে একত্র করে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। তাঁর মতে, ফটোগ্রাফি কেবল দৃশ্য ধারণ নয়; এটি স্মৃতি, অনুভূতি ও সময়ের এক অনন্য ভাষা। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, নাসির আলী মামুন তাঁর সাদাকালো প্রতিকৃতির মাধ্যমে মানুষের অন্তর্জগতকে অসাধারণ সংবেদনশীলতায় তুলে ধরেছেন—বিশেষত শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদের প্রতিকৃতিতে যা গভীরভাবে প্রতিফলিত।

 কবিরা—শব্দের বাইরে, মানুষ হিসেবে

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে নাসির আলী মামুন দেশের শীর্ষস্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের ধারণ করে গড়ে তুলেছেন এক অসামান্য ভিজ্যুয়াল আর্কাইভ। এই প্রদর্শনী উৎসর্গ করা হয়েছে দুই ভিন্নধর্মী কাব্যভুবনের নির্মাতা—শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদকে।

শামসুর রাহমানের কবিতায় নগরজীবনের অন্তর্গত অনুভূতি, মানবিকতা ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট; অন্যদিকে আল মাহমুদের কবিতায় গ্রামীণ জীবন, লোকঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিকতার গভীর ছাপ আধুনিক কাব্যরীতির সঙ্গে মিশে এক অনন্য মাত্রা সৃষ্টি করেছে।

মামুনের ক্যামেরায় এই দুই কবি কেবল সাহিত্যিক নন—তাঁরা একেকজন জটিল, সংবেদনশীল মানবসত্তা। শামসুর রাহমানের প্রতিকৃতিতে ধরা পড়ে নীরব মননশীলতা, আর আল মাহমুদের ছবিতে ফুটে ওঠে গভীর অভিজ্ঞতা ও অন্তর্দৃষ্টির আবেগ—যেখানে মর্যাদা ও নিঃসঙ্গতা পাশাপাশি অবস্থান করে।

 ইতিহাসের এক বিরল মুহূর্ত

এই প্রদর্শনীর অন্যতম আকর্ষণ একটি ঐতিহাসিক সাক্ষাতের দলিল। দীর্ঘদিনের মতপার্থক্যের পর ২০০৪ সালের ৩১ মে শ্যামলীতে শামসুর রাহমানের বাসভবনে নাসির আলী মামুনের উদ্যোগে দুই কবির পুনর্মিলন ঘটে। সেই মুহূর্তের আলোকচিত্র ও ভিডিও—যা পরে প্রথম আলোতে প্রকাশিত হয়—এই প্রদর্শনীতে বিশেষভাবে স্থান পেয়েছে। এটি কেবল একটি সাক্ষাৎ নয়, বরং বাংলা সাহিত্য ইতিহাসের এক আবেগঘন অধ্যায়।

 আলো-ছায়ার নান্দনিকতা

প্রদর্শনীতে প্রায় ৬০টি আলোকচিত্র ও অপ্রকাশিত ভিডিও উপস্থাপন করা হয়েছে। সাদা-কালো আলোকচিত্রের চিরন্তন সৌন্দর্য, আলো-ছায়ার সূক্ষ্ম ব্যবহার এবং সংযত কম্পোজিশন দর্শকদের গভীরভাবে আকৃষ্ট করে। প্রতিটি ফ্রেম যেন কবিদের অন্তর্জগতের দিকে একটি নীরব দরজা খুলে দেয়।

“ফটোসিয়াম: লাইফ অব পোয়েট্রি” কেবল একটি প্রদর্শনী নয়—এটি সাহিত্য ও দৃশ্যশিল্পের মধ্যকার এক গভীর সংলাপ, যেখানে শব্দের বাইরেও অনুভব করা যায় মানুষের উপস্থিতি, নীরবতা ও সত্তা।

 শিল্পী পরিচিতি: ক্যামেরার কবি

১৯৫৩ সালের ১ জুলাই ঢাকায় জন্মগ্রহণকারী নাসির আলী মামুন বাংলাদেশের প্রতিকৃতি আলোকচিত্রের পথিকৃৎ হিসেবে সুপরিচিত। “ক্যামেরার কবি” নামে খ্যাত এই শিল্পী গত পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে শিল্পী, সাহিত্যিক, চিন্তাবিদ ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের সাদা-কালো প্রতিকৃতির মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন এক মূল্যবান ভিজ্যুয়াল আর্কাইভ।

তিনি দেশে-বিদেশে ৬৫টিরও বেশি একক প্রদর্শনী করেছেন এবং রচনা করেছেন ২০টি গ্রন্থ।

সম্মাননার তালিকায় রয়েছে শিল্পকলা পদক (২০১৮), বাংলা একাডেমি সম্মানসূচক ফেলোশিপ (২০২২) এবং একুশে পদক (২০২৫)। বর্তমানে তিনি PHOTOSEUM প্রতিষ্ঠার কাজে নিয়োজিত—যা বাংলাদেশের আলোকচিত্র ঐতিহ্য সংরক্ষণে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

প্রকাশিত সকল ছবির ক্রেডিট: নাসির আলী মামুন।

ভ্রমণডেস্ক

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »
error: Content is protected !!