কুয়ালালামপুরের রঙিন মে মাস: শহরজুড়ে বিনামূল্যের আর্ট, মিউজিক ও পারফরম্যান্সের উৎসব..

কেএল ফেস্টিভ্যাল (৬-৩১ মে) হলো থিঙ্ক সিটি ও ডিবিকেএল-এর সংস্কৃতি-নির্ভর একটি উদ্যোগ, যার লক্ষ্য শহরের কেন্দ্রস্থল কুয়ালালামপুরকে পুনরুজ্জীবিত করা। ২৬টি ঐতিহ্যবাহী স্থানে ৮০টিরও বেশি আয়োজন এবং প্রায় ৭০০ ঘণ্টার কর্মসূচি যার বেশিরভাগই বিনামূল্যে এবং লক্ষ্য ১ লক্ষ দর্শনার্থীর সমাগম।

কুয়ালালামপুর মে মাসে এক মহ-উৎসব আয়োজন করতে যাচ্ছে যা শুধু উৎসবই নয়, এর সঙ্গে রয়েছে একটি সুস্পষ্ট ব্যবসায়িক পরিকল্পনাও।

৬ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত কেএল ফেস্টিভ্যাল শহরের ঐতিহাসিক কেন্দ্রজুড়ে আয়োজন করবে নানা অনুষ্ঠান, ২৬টি ঐতিহ্যবাহী ভবন, রাস্তা, গলি ও উন্মুক্ত স্থানে অনুষ্ঠিত হবে ৮০টিরও বেশি ইভেন্ট এবং প্রায় ৭০০ ঘণ্টার কর্মসূচি।

সংগীত, থিয়েটার, নৃত্য, পাবলিক আর্ট, প্রজেকশন ম্যাপিং, পূর্বপুরুষদের হলঘর ও ঔপনিবেশিক আমলের ভবনে পরিবেশনা সবকিছুই থাকবে এই উৎসবে।

এর বেশিরভাগ আয়োজনই দর্শকরা উপভোগ করতে পারবেন বিনামূল্যে।

উপর থেকে দেখলে এটি নিছক আনন্দঘন এক উৎসব মনে হতে পারে। কিন্তু গভীরে রয়েছে একটি পরিকল্পিত উদ্যোগ, একটি শহর কীভাবে নতুনভাবে গড়ে উঠতে পারে তার হিসাবি পরীক্ষা।

জর্জ টাউন মডেল

কেএল ফেস্টিভ্যালের পেছনে থাকা নগর উন্নয়ন সংস্থা থিঙ্ক সিটি এর আগে এমন উদ্যোগ নিয়েছে।

পেনাং-এর জর্জ টাউন শহরে ঐতিহ্য সংরক্ষণ, সাংস্কৃতিক কর্মসূচি ও উৎসবের সমন্বয়ে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ শহরের পুরনো কেন্দ্রকে নতুন প্রাণ দিয়েছে।

সেখানে হোটেলের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, রেস্তোরাঁর সংখ্যা বেড়েছে ৭৪ শতাংশ, এবং শিল্প ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। মানুষ সেখানে এসেছে এবং বারবার ফিরে এসেছে।

কেএল ফেস্টিভ্যাল মূলত সেই একই ধারণা, এবার প্রয়োগ করা হচ্ছে কুয়ালালামপুরের ডাউনটাউন এলাকায়। ২০২৪ সালে এটির প্রথম আয়োজনেই ১ লাখ ৪০ হাজারের বেশি দর্শনার্থী এসেছিল এবং ৮০০-রও বেশি সৃজনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছিল।

এ বছর লক্ষ্য ২৫ দিনে ১ লাখ দর্শনার্থী, প্রায় ৩০ লাখ রিঙ্গিত বিনিয়োগ, এবং শহরের অর্থনীতিতে সম্ভাব্য ৭.৮৫ বিলিয়ন রিঙ্গিত অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি। কেন ডাউনটাউন কেএল-এর এটি প্রয়োজন

যে কেউ যদি মঙ্গলবার বিকেলে মাসজিদ ইন্ডিয়া এলাকায় হেঁটে বেড়ান, অথবা সন্ধ্যা ৭টার পরে মার্দেকা স্কয়ারে রাতের খাবারের জায়গা খুঁজতে যান তারা সমস্যাটা বুঝবেন।

ডাউনটাউন কুয়ালালামপুর দ্রুত ফাঁকা হয়ে যায়। অফিস সময় শেষ হলেই ভিড় কমে যায়, এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইতিহাসসমৃদ্ধ কিছু রাস্তা নীরব হয়ে পড়ে। কেএল ফেস্টিভ্যাল সেই সমস্যার সরাসরি সমাধান হিসেবে ভাবা হয়েছে। ধারণাটি খুবই সহজ:

মানুষকে শহরে আসার একটি কারণ দিন, যাতে তারা আরও সময় কাটায়, কোথাও খায়, নতুন কোথাও ঘুরে বেড়ায় এবং পরের সপ্তাহান্তেও আবার ফিরে আসে। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে সংস্কৃতি কেবল সাজসজ্জা নয়। এটি আসলে মানুষের পদচারণা বাড়ানোর কৌশল।

সবার জন্য কিছু না কিছু

এই উৎসবের আয়োজন এত বৈচিত্র্যময় যে একটি শহরের প্রাণচাঞ্চল্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

-দাতারান মার্দেকায় জোগেটন

-অডিটোরিয়াম বান্দারায়ায় তিন রাতব্যাপী ‘ইরামা পুসাকা’ সংগীত আয়োজন

-কেএল আর্কিটেকচার ফেস্টিভ্যাল প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে শহরজুড়ে পাবলিক আর্ট ইনস্টলেশন

-ফিলামেনের ‘ওয়ারুং তেরাং’, যেখানে শহরের গলিগুলো আলো ও প্রজেকশন ম্যাপিংয়ের অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত হবে

-রিভার অব লাইফ এলাকায় ‘প্ল্যানেট কেএল’

থিয়েটার ও পারফরম্যান্সের মধ্যে রয়েছে:

-“ফ্র্যাগমেন্টস অব তুয়াহ”, যা সম্প্রতি জাপানের কিয়োটো এক্সপেরিমেন্ট উৎসব থেকে ফিরে এসেছে

-“পেন্ডিং”, যা মঞ্চস্থ হবে চান শে শু ইউয়েন অ্যানসেস্ট্রাল হলে

-“দ্য লেসন্স অব সাইলেন্স”, দ্য গোডাউন আর্টস সেন্টারে

এই উৎসবের সৃজনশীল দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন জুন টান-প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার, শিল্প আন্দোলনকর্মী এবং মালয়েশিয়ার পারফরমিং আর্টস জগতের অন্যতম আন্তর্জাতিকভাবে সংযুক্ত ব্যক্তিত্ব যিনি কেএল ফেস্টিভ্যালের আর্টিস্টিক ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

বিশ্বে এটি আগেই হয়েছে, এবার কেএল-এর পালা

কেএল ফেস্টিভ্যাল একটি বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। এটি ভিজিট মালয়েশিয়া ২০২৬, ওয়ারিসান কেএল পুনর্জাগরণ উদ্যোগ, এবং কুয়ালালামপুরের ইউনেস্কো ক্রিয়েটিভ সিটি অব ডিজাইন মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

থিঙ্ক সিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক দাতো’ হামদান আবদুল মাজিদ সরাসরি বলেছেন এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো বিনিয়োগকারী, বাসিন্দা ও পর্যটকদের দেখানো যে এই শহর এমন একটি জায়গা যেখানে মানুষ থাকতে ও সময় কাটাতে চায়।

যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার এবং এডিনবরার মতো শহর বহু বছর ধরে এমন সাংস্কৃতিক উৎসবের মাধ্যমে অর্থনীতি ও পর্যটনকে শক্তিশালী করেছে।

ম্যানচেস্টার ইন্টারন্যাশনাল ফেস্টিভ্যাল স্থানীয় অর্থনীতিতে ১০০ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি অবদান রাখে, আর এডিনবরো ফ্রিঞ্জ ফেস্টিভ্যাল বছরে ২০০ মিলিয়ন পাউন্ডেরও বেশি অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি করে।

কুয়ালালামপুর এখন তার নিজস্ব সংস্করণ তৈরি করছে ঐতিহ্যবাহী শপহাউস, রিভার অব লাইফ এলাকা, এবং বহুদিন ধরে অপেক্ষায় থাকা ঐতিহাসিক ভবনগুলোকে কেন্দ্র করে।

লেখক: ফার্নান্দো ফং, ১৩ মার্চ ২০২৬

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!