
আপনি কি জানেন, কিছু দেশে বাস্তবে একটির বেশি রাজধানী রয়েছে? হ্যাঁ, একক ও সর্বশক্তিমান রাজধানীর ধারণা বিশ্বব্যাপী মানদ- হয়ে ওঠার আগেই কিছু দেশ ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছিল-যেখানে ক্ষমতা একটি শহরে কেন্দ্রীভূত না হয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে বিভিন্ন স্থানে ভাগ করে দেওয়া হয়। ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক বা কৌশলগত কারণে এসব দেশ সরকারের মূল কার্যাবলি একাধিক স্থানে বিভক্ত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এই ব্যবস্থা প্রথমে বিভ্রান্তিকর মনে হতে পারে, বিশেষত এমন এক বিশ্বে যেখানে অধিকাংশ মানুষ একটি মাত্র রাজধানীর নাম জানতেই অভ্যস্ত।

একইভাবে, দক্ষিণ আফ্রিকা প্রজাতন্ত্রেরও কোনো একক রাজধানী নেই। বরং এটি বিশ্বের অল্প কয়েকটি দেশের একটি, যেখানে রাজনৈতিক ক্ষমতা তিনটি রাজধানীর মধ্যে বণ্টিত-ব্লুমফন্টেইন, কেপ টাউন এবং প্রিটোরিয়া। দক্ষিণ আফ্রিকার এই তিনটি রাজধানী কৌশলগতভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থিত এবং প্রতিটি শহর সরকারের ভিন্ন ভিন্ন শাখার দায়িত্ব পালন করে। একক রাজধানী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে অধিকাংশ মানুষ প্রিটোরিয়ার কথাই বলবেন।
সুতরাং উত্তর হলো-দক্ষিণ আফ্রিকা; এমন একটি দেশ যেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে তিনটি রাজধানী রয়েছে, এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ভিন্নভিন্ন কার্যাবলি এসব রাজধানীর মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
প্রতিটি শহর সরকারের ভিন্ন একটি শাখার কেন্দ্র, এবং বিশ্বের অল্প কয়েকটি দেশের মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকাই এমন স্পষ্টভাবে রাজধানীর ভূমিকা ভাগ করে রেখেছে।
প্রশাসনিক রাজধানী: প্রিটোরিয়া
প্রিটোরিয়া হলো সরকারের মূলকেন্দ্রবিন্দু এবং এটি প্রশাসনিক রাজধানী হিসেবে কাজ করে। প্রেসিডেন্টের কার্যালয়, মন্ত্রিসভা এবং অধিকাংশ জাতীয় সরকারি দপ্তর এখানেই অবস্থিত। বিদেশি দূতাবাসগুলোর উপস্থিতির কারণে একে প্রায়ই দেশের একমাত্র রাজধানী বলে ভুল করা হয়।
জোহানেসবার্গের কাছে গৌতেং প্রদেশে অবস্থিত প্রিটোরিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা রাষ্ট্র হিসেবে গঠিত হওয়ার অনেক আগেই রাজনৈতিক কর্মকা-ের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল।

কেপ টাউন দক্ষিণ আফ্রিকার আইনসভা রাজধানী। এখানে জাতীয় সংসদ বসে, যা জাতীয় পরিষদ (ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি) এবং প্রদেশগুলোর জাতীয় পরিষদ (ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ প্রভিন্সেস) নিয়ে গঠিত। সংসদের অধিবেশন চলাকালে দেশের রাজনৈতিক কার্যক্রম দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে।
ঔপনিবেশিক আমল থেকেই কেপ টাউন আইনসভা কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত, তখনও এটি শাসনকার্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ আসন ছিল। বর্তমানে জনসংখ্যার দিক থেকে এটি দক্ষিণ আফ্রিকার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর এবং বিশ্বের অন্যতম সুপরিচিত নগর কেন্দ্র।

ব্লুমফন্টেইন হলো দক্ষিণ আফ্রিকার বিচারিক রাজধানী। এখানে সুপ্রিম কোর্ট অফ আপিল অবস্থিত, যা দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আদালত। যদিও সর্বোচ্চ আদালত-সংবিধানিক আদালত-জোহানেসবার্গে অবস্থিত, তবু ব্লুমফন্টেইন দেশের বিচারিক পরিচয়ের কেন্দ্রে রয়েছে।
ভৌগোলিকভাবে ব্লুমফন্টেইনের কেন্দ্রীয় অবস্থান নিরপেক্ষতা ও ভারসাম্যের প্রতীক, যা বিচার বিভাগ স্থাপনের জন্য এটিকে স্বাভাবিক পছন্দে পরিণত করেছে।

দক্ষিণ আফ্রিকা কীভাবে তিনটি রাজধানী পেল?
এর উত্তর ইতিহাসে নিহিত। ১৯১০ সালে ইউনিয়ন অব সাউথ আফ্রিকা প্রতিষ্ঠিত হলে চারটি শক্তিশালী উপনিবেশ-কেপ কলোনি, নাটাল, ট্রান্সভাল এবং অরেঞ্জ রিভার কলোনি-একত্রিত হয়। প্রত্যেকটিরই নিজস্ব রাজনৈতিক গুরুত্ব ছিল এবং তারা চাইছিল নতুন রাষ্ট্রের রাজধানী তাদের সীমানার মধ্যেই হোক।
কেপ অঞ্চলের নেতারা প্রতিষ্ঠিত সংসদের কারণে কেপ টাউন চাইছিলেন।
ট্রান্সভাল চাইছিল প্রিটোরিয়া, যা ইতোমধ্যেই একটি প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল।
অরেঞ্জ রিভার কলোনি চাইছিল ব্লুমফন্টেইন, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ আদালতগুলো অবস্থিত ছিল।
কেউই পিছিয়ে যেতে রাজি ছিল না। উত্তেজনা বাড়তে থাকে, সংবাদপত্রগুলো পক্ষ নেয়, আলোচনা অচল হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত একটি বাস্তবসম্মত সমঝোতায় পৌঁছানো হয়-রাজধানীর দায়িত্ব তিনটি শহরের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হবে, যাতে কোনো একক অঞ্চল নতুন রাষ্ট্রে আধিপত্য বিস্তার করতে না পারে।
এক শতাব্দীরও বেশি সময় পরেও এই ব্যবস্থা বহাল রয়েছে। যেখানে অধিকাংশ দেশ একটি রাজধানী কোথায় হবে তা নিয়ে অন্তহীন বিতর্কে লিপ্ত, সেখানে দক্ষিণ আফ্রিকা তিনটি রাজধানী বজায় রেখেছে-প্রতিটিই রাষ্ট্র পরিচালনার ভিন্ন ভিন্ন শাখার দায়িত্বে নিয়োজিত।
আইমান মুরশিদ, ২৩ জানুয়ারি ২০২৬