ইউরোপে ৪.৫ মিলিয়ন চাকরির হাতছানি: বাংলাদেশের তরুণদের জন্য ‘ট্যুরিজম গোল্ড রাশ’

বিশ্ব অর্থনীতির পুনরুত্থানের গল্পে আবারও সামনে এসেছে ভ্রমণ ও পর্যটন খাত। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে World Travel & Tourism Council (WTTC) জানিয়েছে—২০৩৫ সালের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নে পর্যটন খাতে সৃষ্টি হবে ৪.৫ মিলিয়ন নতুন চাকরি। এই খাত তখন ইউরোপে প্রতি ৭টি চাকরির মধ্যে ১টি সরবরাহ করবে এবং অর্থনীতিতে অবদান রাখবে প্রায় €২.৩ ট্রিলিয়ন। এই বিশাল কর্মসংস্থানের ঢেউ কেবল ইউরোপেই সীমাবদ্ধ নয়—এটি বাংলাদেশের জন্যও এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।

সুযোগের অন্য নাম—দক্ষতার সংকট

বিশ্বজুড়ে পর্যটন শিল্প দ্রুত প্রসারিত হলেও একটি বড় সংকট স্পষ্ট—দক্ষ মানবসম্পদের অভাব। আগামী এক দশকে এই খাতে কয়েক কোটি দক্ষ কর্মীর ঘাটতি তৈরি হবে, যার বড় অংশ ইউরোপে। অর্থাৎ, চাকরি প্রস্তুত—কিন্তু দক্ষ কর্মী প্রস্তুত নয়।

এই বাস্তবতা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি “গোল্ডেন উইন্ডো”—যেখানে সঠিক প্রস্তুতি থাকলে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করা সম্ভব।

বাংলাদেশ: সম্ভাবনার দেশ, প্রস্তুতির ঘাটতি

বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী, কর্মক্ষম মানবসম্পদ এবং আতিথেয়তা সংস্কৃতি ইউরোপের পর্যটন খাতে প্রবেশের জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে।

এই প্রেক্ষাপটে ইউরোপের পর্যটন খাতে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলো হলো:

  • হোটেল ও রিসোর্ট ব্যবস্থাপনা
  • রেস্টুরেন্ট ও ফুড সার্ভিস
  • ট্যুর অপারেশন ও ট্রাভেল সাপোর্ট
  • এয়ারপোর্ট ও এভিয়েশন সার্ভিস
  • ক্রুজ ট্যুরিজম
  • কেয়ার ও হসপিটালিটি সাপোর্ট

তবে বাস্তবতা হলো—এই সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখনো এই ক্ষেত্রে কার্যকর কোন নেতৃত্বশীল ভূমিকা পালন করতে পারেনি।

কেন আমরা পিছিয়ে?

সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখনো এই বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। এর পেছনে রয়েছে কয়েকটি কাঠামোগত দুর্বলতা:

  • আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের অভাব
  • ভাষাগত সীমাবদ্ধতা
  • ইউরোপীয় বাজারের সঙ্গে সরাসরি সংযোগের ঘাটতি
  • সমন্বিত সরকারি কৌশলের অনুপস্থিতি

ফলে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আমরা অনেকাংশে পিছিয়ে রয়েছি।

আশার আলো: দেশেই তৈরি হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানের মডেল

এই সীমাবদ্ধতার মাঝেও বাংলাদেশে ইতোমধ্যে একটি অনুকরণীয় উদ্যোগ সফলতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। VROMON-BSDI-TRD আন্তর্জাতিক মানের একটি blended short course in Tourism চালু করে, যা World Bank-এর RELI Project-এর আওতায় বাস্তবায়িত হয়েছে।

এই উদ্যোগের ধারণা ও নেতৃত্ব দেন বিশিষ্ট লেখক, শিক্ষাবিদ এবং এবং ট্যুরিজম রিসার্চ ডেভেলপমেন্ট এর পরিচালক আবু সুফিয়ান। এই প্রকল্পের আওতায় VROMON-BSDI-TRD।

অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা দেশের ২৩ টি জেলার ৩২০০ গ্রামের ৮০০ জন যুবক-যুবতী প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়ে সরাসরি কর্মক্ষেত্রে সংযুক্ত হচ্ছে।

যে কারণে এটি গুরুত্বপূর্ণ:

  • অধিকাংশই অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের সদস্য
  • আন্তর্জাতিক মানের স্কিল ডেভেলপমেন্ট
  • দেশীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন

এই প্রকল্প শুধু প্রশিক্ষণ নয়— এই প্রকল্পের পর্যটন প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম দারিদ্র্য বিমোচন, জীবনমানের উন্নয়ন, অর্থনীতিতে অবদান এবং বাংলাদেশের SDGs অর্জনের বড় সহায়করূপে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে । অর্থাৎ, VROMON-BSDI-TRD এটি প্রমাণ করেছে—বাংলাদেশ চাইলে পারে। বিশ্বব্যাংকের রিলাই প্রকল্পের আওতায় ভ্রমণ বিএসডিআই এর ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম সংক্রান্ত ভিডিও ডকুমেন্টারিটি দেখবার জন্য নিচের লিংকে ক্লিক করুন: VROMON-BSDI-THM Training Program-RELIP-WorldBank-2nd Batch

https://drive.google.com/file/d/1iPyPc5XhPekTYo6i4l4PLXgdZ9BgqMIi/view?usp=sharing

নীতিনির্ধারকদের জন্য বার্তা: এখনই সময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার

বাংলাদেশ যদি ইউরোপের এই ৪.৫ মিলিয়ন চাকরির সুযোগ কাজে লাগাতে চায়, তবে এখনই দরকার সুস্পষ্ট নীতি ও কার্যকর পদক্ষেপ:

  • Tourism Workforce Export Strategy প্রণয়ন
  • আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা
  • ইউরোপীয় ভাষা শিক্ষার বিস্তার
  • দ্বিপাক্ষিক শ্রমচুক্তি বৃদ্ধি
  • আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা চালু
  • পাবলিক-প্রাইভেট অংশীদারিত্ব শক্তিশালী করা
  • নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করা

তরুণদের জন্য বার্তা: দক্ষতাই ভবিষ্যৎ

এই বৈশ্বিক সুযোগ কাজে লাগাতে এখনই প্রস্তুত হতে হবে:

  • যোগাযোগ ও কাস্টমার সার্ভিস
  • ইংরেজির পাশাপাশি ইউরোপীয় ভাষা
  • ডিজিটাল ট্যুরিজম টুলস
  • আন্তঃসংস্কৃতিক দক্ষতা

ইউরোপে মজুরি বাস্তবতা: কেন এই বাজার এত আকর্ষণীয়

ইউরোপের পর্যটন ও হসপিটালিটি খাতে শুধু চাকরির সংখ্যা নয়—মজুরির দিক থেকেও এটি অত্যন্ত আকর্ষণীয়। বিভিন্ন গবেষণা ও শ্রমবাজার বিশ্লেষণ অনুযায়ী:

  • ইউরোপে গড় ঘণ্টাপ্রতি ন্যূনতম মজুরি €১২ থেকে €১৫ ইউরো বা তারও বেশি
  • যুক্তরাজ্যে হসপিটালিটি খাতে ঘণ্টাপ্রতি প্রায় £১২.৩৯ (≈ €১৪-€১৫) পাউন্ড
  • ইউরোপীয় গড় ঘণ্টাভিত্তিক মজুরি প্রায় €২১.৫ ইউরো (সমগ্র শ্রমবাজারে)

এছাড়া মাসিক আয়ের ক্ষেত্রেও দেখা যায়:

  • জার্মানিতে ওয়েটার: €১,৮০০ – €২,২০০ ইউরো
  • ফ্রান্সে: €১,৭০০ – €২,১০০ ইউরো
  • নেদারল্যান্ডসে: €২,৩০০ – €২,৬০০ ইউরো

অর্থাৎ, একজন এন্ট্রি-লেভেল পর্যটন কর্মীও ইউরোপে মাসে €১,৫০০–€২,৫০০+ ইউরো বা বাংলাদেশী মুদ্রায় ২,১৫,০০০ থেকে ৩,৬০,০০০ এত টাকা আয় করতে পারেন।

বাংলাদেশ বনাম ইউরোপ: আয়ের পার্থক্য কেন গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশি কর্মীরা বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যে মজুরি পান, তা তুলনামূলকভাবে অনেক কম: মধ্যপ্রাচ্যে (যেমন UAE): আনুমানিক AED ৩,০০০–৪,৫০০ (≈ €৭৫০–€১,১০০) ইউরো, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আরও কম । তুলনামূলকভাবে ইউরোপে একই ধরনের কাজে দুই থেকে তিনগুণ বেশি আয়, উন্নত কর্মপরিবেশ, সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা ।

কেন এই তথ্য বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ?

এই মজুরি ব্যবধান শুধু ব্যক্তিগত আয়ের বিষয় নয়—এটি একটি জাতীয় অর্থনৈতিক সুযোগ:

  • উচ্চ রেমিট্যান্স প্রবাহ
  • দক্ষ মানবসম্পদের মূল্য বৃদ্ধি
  • দারিদ্র্য বিমোচনে ত্বরান্বিত ভূমিকা
  • বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন খাত

ইউরোপের পর্যটন খাতে শুধু চাকরির সংখ্যাই নয়, মজুরির দিক থেকেও এটি বাংলাদেশের তরুণদের জন্য এক বিপ্লবী সুযোগ। যেখানে মধ্যপ্রাচ্যে একই কাজে একজন কর্মী মাসে €৮০০–€১,০০০ আয় করেন, সেখানে ইউরোপে সেই আয় €২,০০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে। ফলে এটি শুধু কর্মসংস্থান নয়—এটি একটি ‘আয় বিপ্লব’ (Income Transformation Opportunity)।

শেষ কথা: সুযোগ এসেছে, এখন সিদ্ধান্ত আমাদের

ইউরোপের ৪.৫ মিলিয়ন চাকরি বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি সম্ভাবনা নয়—এটি একটি অর্থনৈতিক রূপান্তরের সুযোগ।

VROMON-BSDI-TRD-এর মতো সফল উদ্যোগ যদি জাতীয় পর্যায়ে সম্প্রসারিত হয়, তবে বাংলাদেশ খুব দ্রুতই হয়ে উঠতে পারে একটি “Global Tourism Talent Hub”

প্রশ্ন এখন একটাই ইউরোপে চাকরির এই জোয়ারে, বাংলাদেশ কি প্রস্তুত? — ৪.৫ মিলিয়ন ট্যুরিজম জবের দৌড়ে আমাদের অবস্থান কোথায় ? আমরা কি এই সুযোগ কাজে লাগাতে প্রস্তুত, নাকি আবারও সম্ভাবনাকে হারিয়ে ফেলব?

খালিদ মুহাইমিন (ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিল (ডব্লিউটিটিসি) ৯ এপ্রিল তারিখের রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে প্রস্তুত)

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »
error: Content is protected !!