
প্যাকেট বা টিনজাত খাবার নিয়ে মানুষের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি ও আতংক আছে যে এগুলো সবই অস্বাস্থ্যকর। কিন্তু জানলে অবাক হবেন কিছু টিনজাত মাছ রয়েছে যেগুলো শুধু উপকারি নয়, বরং মানুষের জন্য অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর এবং সেগুলোতে রযেছে অসাধারণ সব পুষ্টগুণ, কঠিন রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা।
• টিনজাত মাছ প্রোটিন ও হৃদ্স্বাস্থ্যের বা হার্টের জন্য উপকারী ওমেগা–৩ ফ্যাটি অ্যাসিড সরবরাহ করে।
• খাদ্যতালিকায় টিনজাত মাছ যোগ করলে ভিটামিন ও খনিজের ভালো উৎস পাওয়া যায়।
• স্যামন, সার্ডিনসহ অন্যান্য মাছ লাল মাংসের বিকল্প হতে পারে।
টিনজাত মাছ হলো পুষ্টির শক্তিশালী উৎস—এতে রয়েছে ওমেগা–৩, প্রোটিন এবং ভিটামিন ডি ও বি১২; পাশাপাশি এটি আজকের পৃথিবীতে তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য।
এমনই পাঁচটি টিনজাত স্বাস্থ্যকর মাছের গল্প থাকছে আজকের ‘দেহভ্রমণ’ বিভাগে…

১. সার্ডিন (Sardines)
সার্ডিন আকারে ছোট হলেও পুষ্টিতে বিশাল।
পুষ্টিগুণ (প্রতি ৩.৫ আউন্স বা ১০০ গ্রাম)
• প্রোটিন: ২৪.৬ গ্রাম (g) — উচ্চমানের পূর্ণাঙ্গ প্রোটিন
• ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড: ৯৮২ মিলিগ্রাম (mg) EPA + DHA
• ভিটামিন ডি: ১৯৩ IU — দৈনিক চাহিদার (DV) ২৪%
• ক্যালসিয়াম: ৩৮২ mg — DV-এর ৩০% (বিশেষত কাঁটা খেলে)
• আয়রন: ২.৯২ mg — DV-এর ১৬%
• পটাশিয়াম: ৩৯৭ mg — DV-এর ৮%¹
কেন গুরুত্বপূর্ণ
কুইনস ইউনিভার্সিটির নিবন্ধিত ডায়েটিশিয়ান নিউট্রিশনিস্ট অ্যাভেরি জেনকার বলেন, “সার্ডিনের মতো কিছু টিনজাত মাছ DHA ও EPA-সহ ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডে সমৃদ্ধ।”
• ওমেগা-৩ (EPA + DHA): প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে এবং হৃদ্যন্ত্র ও মস্তিষ্কের কার্যকারিতা সচল রাখে।
• ভিটামিন D3: সার্ডিন ভিটামিন D3-এর বিরল প্রাকৃতিক পূর্ণাঙ্গ খাদ্য-উৎসগুলোর একটি।
• ক্যালসিয়াম: হাড় ও স্নায়ুর স্বাস্থ্যের জন্য জরুরি; কাঁটা খেলে উপকার আরও বাড়ে।³
• স্বাস্থ্য ও খাদ্য প্রেক্ষাপটে সতর্কতা: দীর্ঘদিন অতিরিক্ত গ্রহণে কাঁপুনি বা স্মৃতির সমস্যার মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। কম পারদযুক্ত মাছ বেছে নেওয়াই উত্তম।

২. স্যামন (Salmon)
টিনজাত স্যামন তাজা ফিলের মতোই অনেক উপকার দেয়, তবে প্রস্তুতির ঝামেলা ছাড়াই।
পুষ্টিগুণ (প্রতি ৩.৫ আউন্স বা ১০০ গ্রাম)
• প্রোটিন: ২০.৬ g
• ওমেগা-৩: মোট ১,২২৭ mg
• ভিটামিন ডি: ১৭২ IU — DV-এর ২২%
• ক্যালসিয়াম: ১৯৮ mg — DV-এর ১৫%
• সেলেনিয়াম: ৩০.১ মাইক্রোগ্রাম (mcg) — DV-এর ৫৫%
• ভিটামিন B12: ০.৪ mcg — DV-এর ১৭%
• আয়রন: ০.৫৭ mg — DV-এর ৩%⁵
কেন গুরুত্বপূর্ণ
জেনকার বলেন, “চর্বিযুক্ত টিনজাত মাছ ভিটামিন D3-এর অল্প কয়েকটি পূর্ণাঙ্গ খাদ্য-উৎসের একটি—যা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা, হাড়-দাঁত ও হরমোনের কার্যকারিতা সচল রাখে।” তাই উত্তরাঞ্চলীয় জলবায়ু বা কম রোদে থাকা ব্যক্তিদের জন্য স্যামন বিশেষভাবে উপকারী।
• ওমেগা–৩: প্রদাহবিরোধী উপকার দেয় এবং হার্ট, মস্তিষ্ক ও রোগপ্রতিরোধ স্বাস্থ্যে সহায়তা করে।
• ভিটামিন ডি: রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা, হাড়ের স্বাস্থ্য ও হরমোন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।
• সেলেনিয়াম: থাইরয়েডের কার্যকারিতা ও প্রজনন স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য।

৩. টুনা (Tuna)
টুনা পরিমিত পরিমাণে খান—বিশেষ করে গর্ভাবস্থায় (প্রায় সপ্তাহে দুইবার) বা শিশুদের ক্ষেত্রে (মাসে ১–২ বার)।
পুষ্টিগুণ (প্রতি ৩.৫ আউন্স বা ১০০ গ্রাম)
• প্রোটিন: ২৯.১ g
• ভিটামিন ডি: ২৬৯ IU — DV-এর ৩৪%
• কার্বোহাইড্রেট: ০ g — স্বাভাবিকভাবেই কম
• মোট চর্বি: ৮.২১ g — তুলনামূলকভাবে কম, তবে স্বাস্থ্যকর ফ্যাটি অ্যাসিড রয়েছে
কেন গুরুত্বপূর্ণ
• প্রোটিন: টুনা প্রোটিনে অত্যন্ত সমৃদ্ধ—পেশি মেরামত ও দীর্ঘক্ষণ তৃপ্তি বজায় রাখতে সহায়ক।
• সতর্কতা: টুনায় তুলনামূলক বেশি পারদ থাকতে পারে। তাই ব্র্যান্ড বাছাই গুরুত্বপূর্ণ। কম পারদযুক্ত ধরন যেমন ক্যানড লাইট বা স্কিপজ্যাক বেছে নিন।

৪. ম্যাকারেল (Mackerel)
টিনজাত মাছের তালিকায় কম-পরিচিত কিন্তু দারুণ পুষ্টিকর রত্ন।
পুষ্টিগুণ (প্রতি ৩.৫ আউন্স বা ১০০ গ্রাম)
• প্রোটিন: ২৩.২ g
• ওমেগা-৩: মোট ১,২৩০ mg
• ভিটামিন ডি: ২৯২ IU — DV-এর ৩৬%
• ভিটামিন B12: ৬.৯৪ mcg — DV-এর ২৮৯%⁸
কেন গুরুত্বপূর্ণ
• হৃদ্ বা হার্টের স্বাস্থ্য: স্যামন ও সার্ডিনের মতোই ম্যাকারেল হৃদ্স্বাস্থ্যে উল্লেখযোগ্য উপকার দেয়।
• ভিটামিন B12: স্নায়ুর সুস্থতা ও লোহিত রক্তকণিকা তৈরির জন্য অপরিহার্য।
• টুনার মতো বিকল্পের তুলনায় সাধারণত কম পারদযুক্ত—তাই নিরাপদ পছন্দ।

৫. অ্যাঙ্কোভি (Anchovies)
আকারে ছোট হলেও পুষ্টিতে ভরপুর আরেকটি শক্তিশালী মাছ।
পুষ্টিগুণ (৫টি অ্যাঙ্কোভি বা ২০ গ্রাম)
• প্রোটিন: ৫.৭৮ g
• ওমেগা-৩: মোট ৪১১ mg
• সোডিয়াম: ৭৩৪ mg — DV-এর ৩২%
• ক্যালসিয়াম: ৪৬.৪ mg — DV-এর ৪%
• আয়রন: ০.৯৩ mg — DV-এর ৫%¹⁰¹¹
কেন গুরুত্বপূর্ণ
জেনকার বলেন, “টিনজাত মাছ প্রক্রিয়াজাত মাংসের ভালো বিকল্প হতে পারে, যা হৃদ্রোগ ও ক্যানসারের মতো নেতিবাচক স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত।”
• সোডিয়াম: অ্যাঙ্কোভিতে সোডিয়াম বেশি থাকে—পরিমিত ব্যবহার করুন।
• পুষ্টি ও স্বাদ: অল্প পরিমাণেই স্বাদ ও পুষ্টি যোগ হয়—ডায়েটে প্রোটিন, ওমেগা-৩ ও আয়রন বাড়ানোর সহজ উপায়।
• ক্যালসিয়াম: কাঁটাসহ খাওয়া যায়—তাই ক্যালসিয়ামের ভালো উৎস।
লেখক: ক্যাথলিন ফেরারো, ২ জানুয়ারি, ২০২৬, মেডিক্যাল রিভিউ: জনাথন পার্টেল, RDN