ড. মোহাম্মদ হান্নান

ঐতিহাসিকরা দাবি করেন ইসলামের আবির্ভাবের পূর্ব থেকেই বাংলা-ভারতের সঙ্গে আরবদের ব্যবসা-বাণিজ্যের একটা সম্পর্ক ছিল। যখন ইসলামের আগমন হলো, তখন এ আরব ব্যবসায়ীরা মুসলমান হয়ে পূর্ববৎ বাংলা-ভারত-আরব বাণিজ্য অটুট রেখেছিল। ইতিহাসবিদ সুরজিৎ দাশগুপ্ত ভারতীয় উপমহাদেশের এক অংশের মালাবার উপকূলের কথা প্রসঙ্গে লিখেছেন:
মালাবার উপকূলে ইসলাম ধর্মের উৎপত্তির আগে থেকেই আরব বণিকদের বসতি গড়ে উঠেছিল।… পরে এই আরবরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। তখন থেকে তারা পরিচিত হয় মুসলমান বলে।১
কোনো কোনো ইতিহাসবিদ এ সম্পর্কে আরও উল্লেখ করেছেন,
আরব নাবিক ও বণিকগণ সদা-সর্বদা বঙ্গদেশ ও কামরূপ হইয়া চীন দেশে যাতায়াত করিতেন।… ইসলাম ধর্মের সকল প্রচার বিবরণ.. তাঁহারা যথাসময়ে সম্যকরূপে অবগত হইতে পারিয়াছিলেন। খুব সম্ভব হিজরি সনের প্রথমদিকেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন।… হিন্দু সমাজের প্রাচীন শাস্ত্রে ও সাহিত্যে মালাবার সম্বন্ধে কিছু কিছু উল্লেখ দেখা যায়। বিশ্বকোষের সম্পাদক মহাশয় তাহার অনেকগুলি উদ্ধৃত করিয়াছেন।… তিনি বলিতেছেন, পরাবৃত্ত পাঠে জানা যায়, চেরর রাজ্যের শেষ রাজা, চেরুমন পেরুমল ইচ্ছাপূর্বক সিংহাসন পরিত্যাগ করিয়া মুসলমান ধর্ম গ্রহণ অভিলাষে মক্কা নগরীতে গমন করেন।
শেখ জয়নুদ্দীন কৃত ‘তোহফাতুল মোজাহেদীন’ পুস্তকেও একজন রাজার মক্কা গমন, তাহার হজরত রাসুলে করিমের খেদমতে উপস্থিত হওয়া এবং স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণের বিবরণ প্রদত্ত হইয়াছে।২
হজনগরী মক্কার সঙ্গে প্রাচীন আমলের বাঙালির সরাসরি যোগাযোগের সংবাদও পাওয়া যায়। জার্নাল অব এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল-এর একটি সংখ্যায় একটি কাহিনি বিবৃত হয়েছে:
বিক্রমপুরের রামপাল নামক স্থানের কাছে কানাইচং নামক গ্রামে একজন মুসলমান বাস করত। সে তার ছেলের জন্ম উপলক্ষে গরু জবাই করে সকলকে খাইয়েছিল। কাছেই ছিলেন রাজা বল্লাল সেন, তিনি গরু জবাইয়ের ব্যাপারটি মানতে পারেন নি। ফলে শাস্তি পেতে হয় ওই গ্রামীণ মুসলিমের। মুসলিম ভদ্রলোক বাধ্য হয়ে বাংলা ছেড়ে সুদূর মক্কা গিয়ে হাজির হন এবং ঘটনা বিবৃত করেন। তাঁকে সাহায্য করার জন্য বাবা আদম নামে এক আরব কয়েক হাজার সাথি নিয়ে বাংলার বিক্রমপুরে আগমন করেন। বল্লাল সেনের সঙ্গে তার যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে বাবা আদম শহিদ হন। বল্লাল সেন যুদ্ধে জিতলেও অগ্নিকু-ে পরিবারসহ ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন।৩
এতে বোঝা যায় প্রাচীন যুগে গ্রামের একজন সাধারণ মুসলমানের কাছেও মক্কা যাওয়া কঠিন কিছু ছিল না। বাংলা-ভারতের ইতিহাসে মুসলমানদের অবদান বিষয়ে নানা গবেষণা করেছেন কথাসাহিত্যিক সত্যেন সেন। তাঁর গ্রন্থে পাওয়া যায়, প্রথম যুগে মক্কানগরীতে হজ করে ফেরার বিবরণ। হজ করে সমুদ্রপথে ফেরার সময়ের করুণ গাঁথা লিপিবদ্ধ করে তিনি লিখেছেন,
…ভাস্কো দা গামা ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করে… কোনোরকম হুঁশিয়ারি না দিয়েই… মালপত্র লুটপাট ও ধ্বংস করতে লাগলেন।… সেই থেকেই ভারত সাগরের বুকে ভাস্কো দা গামা আর তাঁর সহচরদের নৃশংস যথেচ্ছাচার অব্যাহত গতিতে চলল। সেই নিষ্ঠুর ও করুণ কাহিনিগুলোকে ইতিহাস ধরে রাখতে পারেনি।
মক্কা থেকে হজ যাত্রীদের নিয়ে কয়েকটা নিরস্ত্র জাহাজ ফিরে আসছিল। দুর্ভাগ্যক্রমে তারা পর্তুগিজ জাহাজের সামনে পড়ে গেল। জাহাজগুলোকে আটক করে তাদের মধ্যে মালপত্র যা ছিল, সবকিছু তুলে এনে জাহাজগুলোতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হলো।
ভাস্কো দা গামা কালিকটে পৌঁছবার আগেই তাঁর দস্যুবৃত্তির কাহিনি সেখানে পৌঁছে গিয়েছিল। এই সমস্ত খবর শুনে সমস্ত নগরে আলোড়ন পড়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে হজ প্রত্যাগত যাত্রীদের পুড়িয়ে মারবার সংবাদ কি মুসলমান কি হিন্দু সবার মনেই পর্তুগিজদের বিরুদ্ধে দারুণ ঘৃণা ও বিক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল।৪
প্রাচীন আমলের পর মধ্যযুগের এ ঘটনার মাধ্যমে আমাদের কাছে যে সংবাদটি আসছে, তা হলো এদেশের মানুষ সে আমলে ঘটা করেই দলবেঁধে জাহাজে চড়ে হজে যেত। হজে দস্যুদের হামলা হতো, সে হামলা এক সময় সমুদ্রপথে পর্তুগিজ দস্যু ভাস্কো দা গামাই শুরু করেছিলেন। এ সংবাদও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে এসেছে সত্যেন সেনের ভাষ্যে।

তবে হাজিদের বয়ানে হজবিবরণী আমরা পাই অনেক পরে। এমনিতে বাঙালির ভ্রমণ-বিবরণী খুব একটা সে যুগে রচিত হয়নি। অথচ অনেক বিদেশি বাংলাদেশ-ভারত সফর করে অনেক ভ্রমণ বিবরণী সে প্রাচীন সময়েই লিখে গেছেন। হিউ এন সাং, আলবেরুনী, ইবনে বতুতার মতো পর্যটকরা আমাদের কাছে বিখ্যাত হয়ে আছেন বাংলাদেশ সফরকালের ভ্রমণ বিবরণীর জন্যই।
মধ্যযুগের বাংলায় অনেক আখ্যানমূূলক কাব্যে ভ্রমণ কাহিনি রয়েছে। মনসামঙ্গল কাব্য ও চ-ীমঙ্গল কাব্যের চাঁদ সওদাগর অথবা ধনপতি সওদাগরে দেশ-বিদেশ সফরনামা আমাদের সাহিত্যের প্রাচীন ভ্রমণ সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ দলিল। পরবর্তীকালে আধুনিক যুগে যাযাবর ও সৈয়দ মুজতবা আলী ভ্রমণ সাহিত্যের জন্য বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। ১৯০৪ সালে প্রকাশিত বেগম রোকেয়ার কূপম-ুকের হিমালয় দর্শন গ্রন্থটি গদ্য ভাষায় বাঙালি মুসলমানের সবচেয়ে প্রাচীন ভ্রমণ সাহিত্য
পরবর্তীকালে হজ বিবরণী লিখেও বাঙালি মুসলমান প্রচুর ভ্রমণ-সাহিত্য রচনা করেছেন। হালের বিশিষ্ট ভ্রমণ সাহিত্য রচয়িতা ড. মোহাম্মদ আলী খান তাঁর রচিত একজন হজযাত্রীর রোজনামচা (নয়নজুলি, ঢাকা, ২০২৪ সংস্করণ) গ্রন্থের গ্রন্থপঞ্জিতে নিজের গ্রন্থটি ছাড়া আরও ৫৭টি হজ ভ্রমণ সাহিত্য গ্রন্থের তালিকা দিয়েছেন। তবে তাঁর রচিত গ্রন্থের ভেতরে প্রাচীন আমলের হজ ভ্রমণ সাহিত্যের কিছু গ্রন্থের কথা উল্লেখ করেছেন যা একটি বিরল সংগ্রহ:
১. ১০৪৫-১০৫২ খ্রিস্টাব্দে হজ করেছিলেন ইরানের খোরাসানের নাসির-ই-খসরু। তাঁর হজ বিবরণী রয়েছে সফরনামা শিরোনামে।
২. ১১৮৩-১১৮৫ খ্রিস্টাব্দে হজ করেছিলেন স্পেনের গ্রানাডার অধিবাসী ইবনে জুবায়ের। তিনি হজ বিবরণী প্রকাশ করেছেন দিনলিপি শৈলিতে (ডায়েরি স্টাইলে)।
৩. ১৩২৬ খ্রিস্টাব্দে হজ করেছিলেন তাঞ্জানিয়ার ভ্রমণবিদ আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে বতুতা। তাঁর হজ ভ্রমণ কাহিনি বিশ্বজুড়ে নন্দিত।
বাংলা ভাষায় বাঙালি মুসলমানের হজ বিষয়ে ভ্রমণ কাহিনি লিখিয়েদের মধ্যে,
১. খান বাহাদুর আহসানউল্লাহ ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে হজ করেছিলেন এবং ১৯২১ সালে হেজাজ ভ্রমণ নামে তাঁর হজ সফরনামা প্রকাশিত হয়েছিল। খান বাহাদুরের গ্রন্থটিকে কেউ কেউ হজ ভ্রমণ সাহিত্য ‘অন্যতম প্রাচীন গ্রন্থ’৫ বলে উল্লেখ করেছেন।
২. আবদুর রহমান খাঁ হজ করেছিলেন ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের ক্রান্তিকালে। তাঁর লেখা হজের সফর ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৪৯ সালে।
৩. কলকাতার বিশিষ্ট লেখক-গবেষক আবদুল আজীজ আল আমান তাঁর হজ সফর নিয়ে কাবার পথে (দুই খ-) প্রকাশ করেছিলেন ১৯৮৬ সালে কলকাতার হরফ প্রকাশনী থেকে।
বাঙালি মুসলমান নারীগণ খুব বেশি হজ নিয়ে লেখেননি। তবে তালিকাটি কম সমৃদ্ধ নয়;
১. ১৯৯৭ সালে হজ করেছিলেন সুলতানা রাজিয়া। ২০০২ সালে আমার হজ্জ কথা শিরোনামে তাঁর হজ ভ্রমণকাহিনি প্রকাশিত হয়েছিল ঢাকার মাওলা ব্রাদার্স থেকে। তাঁর স্বামী বিশিষ্ট দার্শনিক কমরেড সরদার ফজলুল করিমের একটি ভূমিকা-নামা রয়েছে পরিশিষ্টে।
২. নাজমা ফেরদৌসী: আল্লাহর অতিথি, নোভা পাবলিকেশন্স, ঢাকা, ২০০৯।
৩. কামরুন নিসা দুলাল: নূরানী অ্যালবাম, বনলতা প্রকাশনী, ঢাকা, ২০১১।
৪. সৈয়দা ইসাবেলা: মহাতীর্থ ঘুরে এলাম, পারিজাত প্রকাশনী, ঢাকা, ২০১০।
৫. দিলারা কামাল: সোনালী আলোয় কাবার দ্বারে, ইথার প্রকাশনী, ঢাকা, ২০০২।
৬. হাবিবা চৌধুরী সুইট: হজ্জ আমার অনুভূতি, ঢাকা, ২০০৭।
৭. হানুফা ইমদাদ: হজের কথা, পালক পাবলিশার্স, ঢাকা, ২০১১।৬

বাঙালি মুসলমানের হজ ভ্রমণকাহিনি নিয়ে দুটো গ্রন্থ বা লেখা পাঠকের সামনে এসেছে সাম্প্রতিক সময়ে। এর একটি, ১. মোহাম্মদ বদরুদ্দোজা: ভ্রমণ বৃত্তান্ত, মোহাম্মদ সইদুর রহমান মিঞা প্রকাশিত, রামু (কক্সবাজার), ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দ, বাংলা ১৩২৩ সাল। মূল্য ছিল আট আনা।
দ্বিতীয়টি, ২. ইয়াসিন আলী সরকার : শতবর্ষ প্রাচীন হজের ডায়েরি, প্রথমআলো, ঢাকা, ঈদসংখ্যা, এপ্রিল ২০২৪।
এই দ্বিতীয়টি টাঙ্গাইল নিবাসী ইয়াসিন আলী সরকারের হজের ডায়েরি, যা ১৯৩০ সালে লেখা হয়েছিল, ২০২৪ সালের আগ পর্যন্ত তা আলোর মুখ দেখেনি। আর প্রথমটি, মোহাম্মদ বদরুদ্দোজা প্রণীত হজ ভ্রমণ বৃত্তান্ত, ১৯১৬ সালে প্রকাশিত হলেও তা এতদিন হারিয়ে যাওয়া গ্রন্থের তালিকাতেই ছিল বলা চলে। ২০২৩ সালে কলকাতার প্রতিক্ষণ প্রকাশনা সংস্থা থেকে তা নতুন করে প্রকাশিত হয়ে তার ঐতিহাসিকতার স্থানটির কথা জানান দিয়েছে।৭
এর আগে ১৯২১ সালে প্রকাশিত হয়েছিল খান বাহাদুর আহছানউল্লাহর হেজাজ ভ্রমণ। ১৯৩৫ সালে এর দ্বিতীয় সংস্করণ হয়েছিল। সর্বশেষ ২০০৯ সালে আহছানিয়া মিশন থেকে এর একটি নি¤œমানের মুদ্রণ বাজারে আসে।
তবে মোহাম্মদ বদরুদ্দোজার ভ্রমণ বৃত্তান্ত, গ্রন্থটি যথার্থই ভ্রমণ বিবরণী। কারণ তিনি হজ উপলক্ষে মক্কা-মদিনা সফর ছাড়াও আরও কতকগুলো পবিত্রস্থান সফর করেছিলেন, সেগুলোও এ গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। যেমন, ১. আরব দেশ ভ্রমণ (মক্কা ও মদিনা) ২. শাম ভ্রমণ (সিরিয়া) ৩. বায়তুল মোকাদ্দাস ভ্রমণ, ৪. মিশর ভ্রমণ ৫. বাগদাদ (ইরাক) ভ্রমণ।
সেকালে হজ ভ্রমণের সাথে অনেকেই হয়তো ইরাক, সিরিয়া, মিশর ইত্যাদি দেশগুলোও সফর করতেন বলে প্রতীয়মান হয়। বিশেষ করে পবিত্র শহর জেরুজালেমে অবস্থিত বায়তুল মোকাদ্দাস সফর ছিল খুবই আকাক্সিক্ষত। তখন তো ইসরাইল নামক রাষ্ট্র ছিল না, ফলে এ পবিত্র শহরে অন্যান্য শহরের মতোই যাতায়াত করা সম্ভব ছিল। মোহাম্মদ বদরুদ্দোজা তাই তাঁর হজ বিবরণী লিখতে গিয়ে বইয়ের নামকরণ করেছেন ভ্রমণ বৃত্তান্ত। কারণ মক্কা-মদিনায় হজ ছাড়াও তাঁর সফর তালিকায় ছিল সিরিয়া-ইরাক-মিশর থেকে জেরুজালেম পর্যন্ত।
মোহাম্মদ বদরুদ্দোজা ও ইয়াসিন আলী সরকারের হজ ভ্রমণ কাহিনি দুটো খুব কাছাকাছি সময়ে লেখা। বদরুদ্দোজা ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে এবং ইয়াসিন আলী ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে, মাত্র পনেরো বছর এদিক-সেদিক সময়ে লেখা হয়েছে। দু’জনই ধর্মীয় উদ্দেশে তীর্থ ভ্রমণের কথা লিখেছেন, কিন্তু দু’জনের ভাষায় অপরূপ মিল। সে আমলের মুসলমানী গদ্যই তাদের লেখায় অনুসৃত হয়েছে। শুধু তা নয়, বরং ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের ১৮০১ সালের সংস্কৃতানুসারী বাংলা গদ্যতেই তাঁরা প্রাঞ্জল ছিলেন। মোহাম্মদ বদরুদ্দোজা ‘বিসমিল্লাহ’ না লিখে, লিখেছেন,
পরম দাতা দয়ালু আল্লাহর নামে আরম্ভ করিতেছি। [পৃষ্ঠা ২৩]।
অন্যত্র,
পাঠক! স্মরণ রাখিবেন, প্রত্যেক কার্য্যরে প্রারম্ভে বিশুদ্ধ মনন করা আবশ্যক। (পৃষ্ঠা ২৬]।
আরও,
পাঠক! যিনি স্বর্গলাভের জন্য সৎকর্ম্ম করেন, তিনি লোভী ও বাসনার দাস। [পৃষ্ঠা ২৭]।
বদরুদ্দোজা তাঁর গ্রন্থে হজের অনেক তাত্ত্বিক বিষয়ও উপস্থাপন করেছেন, আর এগুলোর ভাষাও পূর্ববৎ:
১. হজ্জ-যাত্রীকে বৈধ উপার্জ্জনের ধন পাথেয় স্বরূপ লইতে হইবে এবং সন্দেহের ধন পরিত্যাগ করিতে হইবে। [পৃষ্ঠা ৩১]।
২. সমুদ্র-বক্ষে জাহাজে সতত বিশ্বপতির নাম জপ ও দরুদ পাঠে নিমগ্ন থাকা কর্তব্য। [পৃষ্ঠা ৩৮]।
৩. সেই অনন্ত বিশাল জলানিধির গম্ভীর মূর্তি দর্শন করিলে অন্তরে এক অপূর্ব ভাবের উদয় হইয়া থাকে। [পৃষ্ঠা ৩৮]।
৪. গমনাগমনের জাহাজে প্রায়ই এই স্থান হইতে জল ও কয়লা লওয়া হয়। [পৃষ্ঠা ৪০]।
৫. এখানে (জেদ্দায়) আদিমাতা হাওয়া বিবির (আ.) সমাধি আছে। তাঁহার পদস্থানে, মস্তক স্থানে এবং মধ্যভাগে এই তিন স্থানে তিনটি মন্দির বিরাজ করিতেছে। [পৃষ্ঠা ৪৯]।
৬. জেদ্দা হইতে উষ্ট্রযোগে মক্কা-মোয়াজ্জমাস্থ সম্মানিত কাবা মন্দিরে গমন করিতে হয়। [পৃষ্ঠা ৫০]।
৭. মদিনা নগরে প্রবেশ করিয়া প্রথমতঃ অবগাহন করিয়া সৌগন্ধ দ্রব্য ব্যবহার এবং নূতন বস্ত্র পরিধান-পূর্ব্বক দীনতা ও ন¤্রতা সহকারে হজরতের সম্মানিত সমাধি দর্শন, তথায় তাঁহার রৌজা ও মিম্বরের মধ্যবর্তী স্থানে নামাজ, দোওয়া এবং বহুবার দরুদ ও সালাম পাঠ করা কর্তব্য। কেননা ইহা স্বর্গের একাংশ বলিয়া কথিত আছে। [পৃষ্ঠা ৬৩]।৮
বদরুদ্দোজা বিশ শতকের প্রথমার্ধে গ্রন্থ রচনা করতে গিয়ে যে গদ্য-ভাষা ব্যবহার করেছেন তা একান্তভাবে তৎকালীন, বঙ্কিমীশৈলীর ভাষা। ‘বিস্মিল্লাহ’ না বলে এর বাংলা ‘পরমদাতা দয়ালু আল্লাহর নামে’ লেখা শুরু করেছেন। অন্য জায়গায় আল্লাহ না লিখে ‘বিশ্বপতি’ লিখেছেন। ‘পানি’ না লিখে তিনি লিখেছেন ‘জল’। ‘মিনার’ না লিখে লিখেছেন ‘মন্দির’। আবার ‘কাবাঘর’ না লিখে লিখেছেন তিনি ‘কাবামন্দির’। জান্নাত বা বেহেশত না লিখে তিনি সর্বত্র ‘স্বর্গ’ই লিখেছেন। এ গদ্য ভাষা বিশ শতকের মুসলমানী গদ্য থেকে তাঁকে একটু আলাদা করেই রেখেছে।
পাশাপাশি ১৯৩০ সালে ইয়াসিন আলী সরকার হজের যে ডায়েরি লিখেছেন, তাতেও প্রায় একই রকম গদ্যশৈলী অনুসৃত হয়েছে। যেমন,
১. অদ্য ২৩শে মার্চ রবিবার আল্লাহর ওয়াস্তে ২ রাকাত শোকরানা নামাজ আদায় পূর্বক জন্মভূমি ভারতের বুক শূন্য করে দয়াময়ের নাম করিতে করিতে বেলা ১০ ঘটিকায় জাহাজের উদ্দেশে পূর্ব দিকে ডকে চলিলাম।
২. অদ্য ২৬শে মার্চ ফজর বাদ উপরে যাইয়া দেখি, দরিয়ার জল অত্যন্ত স্থির রহিয়াছে। পশ্চিম দিকে প্রাচীরের ন্যায় দূরবর্তী পর্বত অস্পষ্টরূপে সময় সময় তড়িৎ-রেখাবৎ দেখা দিয়া অদৃশ্য হইয়া যায়।
৩. অগত্যা গেট দিয়া নিষ্ক্রান্ত হইয়া ভিখারিদলকে কিছু আল্লাহর ওয়াস্তে দিয়া বিদায় করিলাম।
৪. অদ্য পহেলা জুন রবিবার প্রাতে তীরে অবতরণ করিব বলিয়া সকলেই মহোল্লাসে মুগ্ধ। রাত্রিভর নিদ্রাদেবীর আশ্রয় পাইলাম।
৫. ধন্য লীলাময়! তোমার লীলার অবধি নাই। তিন মাস পর পুনঃ স্বস্থানে মিলিত করিলেন।৯
ইয়াসিন আলী সরকারের এ সাধু-গদ্য-ভাষা লক্ষণীয়। কোথাও কোথাও আরবি-ইংরেজি মিশ্রিত থাকলেও মূল ভঙ্গিমা বঙ্গিমী গদ্যের। তিনি আরবি ‘আল্লাহর ওয়াস্তে’ শব্দ লিখলেও সৃষ্টিকর্তার প্রতিশব্দ হিসেবে ‘লীলাময়ী’, ‘নিদ্রাদেবী’ ইত্যাদি শব্দও প্রয়োগ করেছেন। তাঁর ‘জলভূমি ভারতের বুক শূন্য করে’, ‘দয়াময়ের নাম করিতে করিতে’, ‘দরিয়ার জল’, ‘দূরবর্তী পর্বত’, ‘তড়িৎ রেখাবৎ’, ‘অগত্যা’, ‘নিষ্ক্রান্ত হইয়া’ ইত্যাদি শব্দ-বাক্য গভীরভাবে মনোযোগ আকর্ষণ করে। বিশ শতকের বড়ো বড়ো মুসলমান গদ্যকাররা যেসব গদ্য রচনা করেছেন, ইয়াসিন আলী সরকারের গদ্যশৈলী তার থেকে ব্যতিক্রম নয়। অথচ তিনি যে সফর করেছেন তা ছিল ধর্মীয়।
মোহাম্মদ বদরুদ্দোজা ও ইয়াসিন আলী সরকারের, দুটো রচনাতেই মিলবে প্রচুর লোকজ শব্দও, যা এখন বাংলা ভাষা থেকে হারিয়ে গেছে অথবা স্বল্প ব্যবহৃত হয়ে থাকে। প্রথমে বদরুদ্দোজার গ্রন্থ থেকে:
১. কলিকাতার খোরাকী ও বাজে খরচ : ৩ টাকা। [বদরুদ্দোজা, পৃষ্ঠা ১৮]।
‘খোরাকী’ ফারসি শব্দ, অর্থ : খাই-খরচ, খাওয়ার ব্যয়। ‘বাজে’ আরবি শব্দ, অর্থ : অনাবশ্যক, অতিরিক্ত। বিশেষ বিশেষ স্থানকাল নির্বিশেষে শব্দগুলো ব্যবহৃত। গ্রামে ‘খোরাকী’ মজুরির প্রতিশব্দ হিসেবেও চালু ছিল।
২. চার প্যালা-তস্তুরি, চামচ ও বর্ত্তন। [বদরুদ্দোজা, পৃষ্ঠা ১৮]।
‘প্যালা’ মানে পেয়ালা। শব্দটি ফারসি ‘পিয়ালাহ’ থেকে আগত। অর্থ : ক্ষুদ্র পানপাত্র বা বাটি।
‘তস্তুরি’ও ফারসি শব্দ। তশতরি থেকে তসতরি। অর্থ : পিরিচ।
‘বর্ত্তন’, উর্দু শব্দ এটি। অর্থ : থালা-বাসন।
এসব শব্দ এক সময় সামাজিকভাবে প্রচলিত ছিল, পরে শুধু গ্রাম সমাজেই ব্যবহৃত হতো। এখন গ্রামেও এর বিশেষ প্রচলন নেই। লোকজ শব্দ হিসেবে মাঝে-মধ্যে সামাজিক কর্মকা-ে উঁকিঝুঁকি দেয়।
ইয়াসিন আলী সরকারের রচনায়ও প্রচুর লোকজ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, যেসব শব্দ এখন বাংলা ভাষা থেকে বিলীন হয়ে গেছে। যেমন,
১. ‘টাট্টি, জলের কল, হাম্মামখানা সবই সুন্দর’। [পৃষ্ঠা ২৬]।
এখানে ‘টাট্টি’ একটি হিন্দি শব্দ, যা পায়খানা বা মলত্যাগের স্থান হয়ে থাকে। সাধারণভাবে বাঁশের তৈরি বেড়া দিয়ে বানানো মলত্যাগের স্থানকে গ্রামে টাট্টি’ বলা হতো।
‘হাম্মাম’ আরবি শব্দ, যার অর্থই গোসলখানা, সে ক্ষেত্রে ‘হাম্মামখানা’ শব্দটিতে ভুলভাবে ‘খানা’ যুক্ত হয়ে প্রচলিত ছিল। যেসব গোসলখানায় গরম পানির ব্যবস্থা থাকে, বলা চলে প্রাচীন সময়ে বিলাসী গোসলখানা ‘হাম্মাম’ হিসেবে পরিচিত ছিল।
২. ‘খোলা মাথায় খোলা গায়ে একখানা তহবন পরনে’। [পৃষ্ঠা ২৭]।
‘তহবন’ ফারসি শব্দ, এর অর্থ লুঙ্গি। তহবন্দ থেকে তহবন, তার থেকে ‘তবন’ এবং গ্রামে শব্দটি ‘তফন’ হিসেবেই সমধিক পরিচিত ছিল।
৩. ‘একটি সিকি ভাঙ্গাইয়া ১৪টি আরবি মুদ্রা লইয়া খয়রাত দিতে রাখিয়া দিলাম’। [পৃষ্ঠা ২৮]।
সিকি আরবি শব্দ, এর অর্থ চতুর্থাংশ। পূর্বে পাকিস্তান আমলে আমাদের দেশে সিকি মানে ছিল চারআনা, অর্থাৎ একটাকার চারভাগের একভাগ।১০
খয়রাতও আরবি শব্দ। অর্থ ভিক্ষা বা দান। পূর্বে গ্রামে বাড়ি বাড়ি ঘুরে ভিক্ষুকরা ভিক্ষা করতে গিয়ে সজোরে বলতো, ‘খয়রাত দেন গো মা’। এখন ভিক্ষুকরা ‘খয়রাত’ বলেন না।
মোহাম্মদ বদরুদ্দোজা প্রণীত ভ্রমণ বৃত্তান্ত-এ হজের তৎকালীন রাহা খরচ ও অন্যান্যর একটি হিসাব দেওয়া হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেছেন,
১. ‘হজব্রত সমাপনে’ লাগবে ৩৫৭ টাকা ১২ আনা।
২. ‘মদিনা দর্শন করিতে’ লাগবে আর ৪৫৭ টাকা ১২ আনা।
৩. কেউ যদি এর সঙ্গে সিরিয়া, মিসর, জেরুজালেম সফর করে, তাহলে লাগবে অতিরিক্ত আরও ৬০২ টাকা ৮ আনা।
৪. তবে কম আয়ের লোকেরা ইচ্ছে করলে ৩০০ টাকা ব্যয় করলেও ‘কোনোমতে’ হজ করতে পারবেন বলে লেখক জানিয়েছেন। আর মদিনা সফর করলে লাগবে আরও ৪০০ টাকা।১১
এখনকার দিনে হজের সফরের সঙ্গে সিরিয়া, মিশর, জেরুজালেম ভ্রমণের সুযোগ নেই। তখন ইসরাইল রাষ্ট্র ছিল না, তাই জেরুজালেম গিয়ে বায়তুল মোকাদ্দাস জিয়ারত করা যেত। আজকের দিনে মক্কায় হজ এবং মদিনা সফর করতে ৫ থেকে ৮ লাখ টাকা সাধারণেরই ব্যয় হয়ে থাকে। পার্থক্যটা সহজেই ধরা পড়ে।
সেকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম থেকে কলকাতা হয়ে বোম্বে (বর্তমানে মোম্বাই) হয়ে জাহাজে চড়ে জেদ্দা যেতে হতো। জাহাজ ভাড়া ছিল ৭০ টাকা। জেদ্দা থেকে মক্কায় উটের ভাড়া ছিল ১০ টাকা। আর উট চালককে বকশিশ দেওয়ার জন্যও বাজেটে টাকা রাখতে হতো ১ টাকা। মক্কায় ঘর ভাড়া ছিল ৪ টাকা। হজের দিন আরাফাতের ময়দানে তাঁবু ভাড়া হিসেবেও দিতে হতো ২ টাকা। আর মক্কা থেকে মদিনা যেতে উটের ভাড়া ছিল ৬০ টাকা, উটের চালককে বকশিশ দিতে রাখতে হতো আরও ৫ টাকা।
সে সময়ও হজ সফরে পাসপোর্ট প্রয়োজন হতো। জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অফিস থেকে এক পয়সার ফরম পূর্ণ করে পাসপোর্ট পাওয়া সহজ ছিল। কেউ এটা করতে না পারলে বোম্বাইয়ের তুরস্ক-কনসাল অফিস থেকে পাসপোর্ট করার সুযোগ গ্রহণ করতেন। সম্ভবত সে সময় মক্কা-মদিনা তুরস্কের সুলতানের অধীন ছিল। লেখক এক জায়গায় বর্ণনা করেছেন, ‘জেদ্দায় তুরস্কের বহুসংখ্যক সৈন্য অবস্থান করে, তাহাদের কুচ-কাওয়াজ দেখিলে বিস্ময়াম্বিত হইতে হয়’।১২
অন্যত্র, মদিনা নগরীর বর্ণনায় লিখেছেন, ‘এই নগরীর চতুর্দিকে প্রাচীরে বেষ্টিত; লোকের গমনাগমনের জন্য ৭টি দ্বার আছে।
প্রত্যেক দ্বারে তুর্কি সৈন্য অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিতভাবে অনবরত দ-ায়মান থাকে।১৩
সেকালে কতলোক আমাদের দেশ থেকে হজ করতে মক্কায় যেতেন তারও একটি পরিসংখ্যান বদরুদ্দোজার বইতে পাওয়া যায়। তিনি জানিয়েছেন, ১৯১৩ সালে ১৮ই মেÑ২৩শে অক্টোবর পর্যন্ত প্রথম দফায় ২০টি জাহাজে মোট ১৫,৩২০ জন লোক হজ করেছিলেন। আর দ্বিতীয় দফায় ১৯১৩ সালের ২রা ডিসেম্বরÑ১৯১৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ১৭টি জাহাজে করে হজ করেছিলেন ১২,৪৮৭ জন।১৪ অর্থাৎ এই ১৯১৩-১৪ সালে হজ করেছিলেন বাংলাদেশের প্রায় ২৮ হাজার হাজি। সে সময়ে হাজির সংখ্যা ছিল এমনই। সে সময়ের তুলনায় বর্তমান জামানায় হাজির সংখ্যা খুব বাড়েনি। ২০২৩ সালে ১ লাখেরও কিছু বেশি বাঙালি মুসলমান হজ করলেও ২০২৪ সালে হাজির সংখ্যা ৮৫ হাজারের কাছাকাছি মাত্র ছিল। খান বাহাদুর আহছানউল্লাহ তাঁর গ্রন্থ হেজাজ ভ্রমণ (প্রথম প্রকাশ ১৯২১) গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ১৯১৪ সালের বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে সমগ্র দুনিয়া থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার হাজি হজ করেছিলেন। [হেজাজ ভ্রমণ, পৃষ্ঠা ৪৬]।
মোহাম্মদ বদরুদ্দোজা তাঁর প্রণীত গ্রন্থ ভ্রমণ বৃত্তান্ত-এর মাধ্যমে আমাদের এসব তথ্য জানাচ্ছেন, যা ১৯১৬ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। এর আরও পনেরো বছর পর ইয়াসিন আলী সরকার তাঁর হজের ডায়েরি লিখেছিলেন। ইয়াসিন আলী সরকারের লেখা থেকে বোঝা যায়, মোহাম্মদ বদরুদ্দোজার বৃত্তান্তের হেজাজ (মক্কা-মদিনা)-এর শাসক ও শাসনব্যবস্থা তখন আর বলবৎ নেই। এ সময়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে হেজাজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারায় তুরস্ক। ব্রিটিশ প্রভাবিত এক বাদশাহী যুগের সূচনা হয় হেজাজের ওপর। এ সময়ই হজ সফর করেন ইয়াসিন আলী সরকার। তাঁর ডায়েরিতে ধরা পড়েছে এ সময়ের সৌদি আরবের চিত্রমালা:
মক্কার পূর্বপ্রান্তে জিন্নতমালা। উহার পার্শ্বেই বর্তমান শাসনকর্তার সুরম্য প্রাসাদ। আরও বর্ধিত করা হইতেছে। চন্দ্রোদয়ের পরদিন এবনে সাউদ মক্কা নগরীতে সদলবলে আগমন করিয়াছেন। ইনি দেখিতে অত্যন্ত সুশ্রী, হৃষ্টপুষ্ট যুবক, মুখে দাড়ি, কিন্তু ডান চক্ষুটি একটু খারাপ। সর্বদা চশমা চোখে দিয়া থাকেন।১৫
অন্যত্র,
… পবিত্র জান্নাতুল বাকির গোর জেয়ারতে চলিলাম। বর্তমান শাসনকর্তারা সমাধির চিহ্নমাত্র লোপ করিয়া ফেলিয়াছে। বাস্তবিকই রমণীয় সমাধিস্থান হিন্দুদের শ্মশানের মতো করিয়া ফেলিয়াছে। দর্শনমাত্র হৃদয় শতধা বিদীর্ণ হইয়া যাইতে লাগিল।১৬
এরকম আরও অনুভূতি,
পবিত্র জান্নাতুল বাকিতে… একত্র মাজার শরিফ দর্শন করিলে দুনিয়ার খেয়াল থাকে না, থাকিতে পারে না। কিন্তু এবনে সাউদ যে এই পরমাত্মাদের চিরনিদ্রায় এত ব্যাঘাত করিয়াছে, ইহা বাস্তবিকই হৃদয়বিদারক ঘটনা।১৭
আর প্রশাসনের অন্দরের ছবিও কঠিনভাবে লিখতে লেখক ভোলেননি:
এই দেশের বর্তমান গভর্নমেন্ট এবনে সাউদের কঠোর শাসনে দস্যুর ভয় অনেকটা কম বলিয়া বোধ হইতেছে। কিন্তু ওই অফিসারগুলোই আমাদের দেশের অফিসারদের মতো হাড়ে হাড়ে চোর।১৮
হজযাত্রী হিসেবে লেখককে সাহসী কলমধারী হিসেবেই ডায়রিতে পাই। সাধারণভাবে হাজিরা দুপাশে যেসব অনিয়ম, অব্যবস্থা দেখতে পান, তাতে সবর করে থাকেন, সমালোচনা থেকে বিরত থাকেন। এটাই হজের একটি বৈশিষ্ট্য। ইয়াসিন আলী সরকার এসব বিষয়ে রাখ-ঢাক না করেই লিখে ফেলেছেন, ‘স্থানে স্থানে গেটে এবনে সাউদের পুলিশ বন্দুক হস্তে পাহারা দিতেছে। মোটরের খেরাখেরিতে ধূলার জন্য চক্ষু মেলা দায় হইয়া উঠিল’।১৯
১৯২০ সালে হজ করেছিলেন খান বাহাদুর আহছানউল্লাহ। ১৯২১ সালে তাঁর হেজাজ ভ্রমণ প্রকাশিত হয়। সেখানে তিনিও সৌদীর তৎকালীন বাদশাহ এবনে ছউদকে আরবের স্বৈরশাসক, চরমপন্থী ও ওহাবী-দলপতি বলে উল্লেখ করেছিলেন।২০
সফরকালে টইটম্বুর জাহাজের পারিপার্শ্বিক অবস্থানটিও ইয়াসিন আলী সরকারের ডায়েরিতে স্থান পেয়েছে। কী কঠিন ছিল সেদিনের হজ-যাত্রা:
অত্যধিক গরমে প্রাণ ত্রাহি ত্রাহি করিতে লাগিল। কাজেই লোকের ব্যারাম না হইয়া যায় না। এ জাহাজে আরোহী ১,৪০০ জনের স্থান। তন্মধ্যে আরোহী ১,৮০০। স্থানের অভাব, বহুলোকের, সমাগম ও লোহিত সাগরের অগ্নিময় হাওয়ায় লোক খুবই পীড়িত হইতে লাগিল। বুঝিবা কখন প্রাণপাখী পিঞ্জর ছাড়িয়া পালাইয়া যায়।২১
১৯২১ সালে প্রকাশিত খান বাহাদুর আহছানউল্লার গ্রন্থেও হজ যাত্রায় সমুদ্রের এরকম ভয়াবহ বর্ণনা রয়েছে:
অদ্য (৫ই জুলাই ১৯২০) সমুদ্রে ভয়ানক তুফান ছিল। যাত্রীগণ হঠাৎ অস্থির ও বিচলিত হইয়া পড়িল। বসন ও শিরোঘূর্ণাবশতঃ অল্পক্ষণের মধ্যে সকলেই অধীর হইয়া উঠিল। …আমাদের আহারাদি বন্ধ রহিল। কেবলমাত্র চায়ের উপর নির্ভর করিয়া থাকিলাম। জাহাজের ওপর কেহ যথেচ্ছ যাতায়াত করিতে পারিত না। জিনিসপত্র পড়িয়া ভাঙ্গিতে লাগিল। আরোহীগণ শয্যাশায়ী হইল। …অনন্ত সমুদ্রের ওপর দয়াময়ের সাহায্যব্যতীত কিছুই প্রার্থনীয় ছিল না। অনেক সংজ্ঞাহীন হইয়া পড়িল। কেহ-বা আত্মঘাতী হইতে চাহিল।২২
হজ সফরকালে এরকম কত যে প্রাণপাখি বের হয়ে গেছে, তার সংবেদনশীল বর্ণনা পাঠককে আপ্লুত করে:
১. অদ্য জাহাজে থাকা জনৈক বৃদ্ধ হাজী মারা গেল। [শতবর্ষ প্রাচীন হজের ডায়েরি, পৃষ্ঠা ২৫]।
২. দুপুরবেলা উপরে যাইয়া শুনিলাম, দুইজন লোক জন্মশোধ বিদায় লইয়াছে। একজন জামালপুর এলাকার অন্য একজন ত্রিপুরাবাসী। [পৃষ্ঠা ২৫]।
৩. এহরাম বাঁধা অবস্থায় জনৈক হাজী মারা গেল। আমরা জানাজা পড়িয়া লোহিত সাগরে তাহাকে জন্মের মতো বিদায় দিলাম। [পৃষ্ঠা ২৭]।
৪. বেলা ৯টায় শুনিলাম দুই দিনে ১২টি লোক মারা গিয়াছে। [পৃষ্ঠা ২৭]।
৫. অদ্য মাগরিব বাদে নওয়াজেশ খলিফার পিতাকে জানাজা করিয়া ফেলিয়া দিল। দুপ্রহরেও একজন লোক মারা গিয়াছে শুনিলাম। [পৃষ্ঠা ২৭]।
৬. অদ্য এই জ্যৈষ্ঠ রবিবার প্রাতে এডেন বন্দর ছাড়াইলাম। আজও… একজন হাজী মারা গেল। আজ জাহাজ আরব সাগরে পড়িয়াছে। [পৃষ্ঠা ৩৭]।
৭. অদ্যকার দিনে… তিনজন লোক মারা গেল। তন্মধ্যে হিন্দুস্থানি এক বৃদ্ধের একটি ১০-১২ বছর বয়স্ক ছেলে। ওই বৃদ্ধের হাবভাব দর্শন করিলে পাষাণও গলিত হয়। [শতবর্ষ প্রাচীন হজের ডায়েরি, পৃষ্ঠা ৩৭]।
প্রথম যুগে হজ-যাত্রা নিয়ে বাঙালি মুসলমানের এসব ভ্রমণ সাহিত্য ছিল অসাধারণ নৈপুণ্যে ভরা। তাঁদের ভাষা, শব্দ চয়ন সমকালীন মূল ধারার সাহিত্যের সঙ্গে তুলনীয়। মোহাম্মদ বদরুদ্দোজার গ্রন্থ থেকে একটি দৃষ্টান্ত :
আরাফার ময়দানে পৃথিবীর যাবতীয় দেশ, প্রদেশ, নগর, গ্রাম এবং পল্লী হইতে বিভিন্ন ভাষাভাষি লোক যখন একত্রিত হইয়া আপন আপন ভাষায় দোয়া-প্রার্থনা করিতে থাকে, তখনকার সেই দৃশ্য ঠিক যেন কেয়ামতের দিবস হাশরের ময়দানে সমস্ত পৃথিবীর লোক একত্র সমাবেশ হওয়ার তুল্য।২৩
ইয়াসিন আলী সরকারের লেখায় এই একই বিষয় ধরা পড়েছে নি¤েœাক্তভাবে,
পবিত্র আরাফাত মহাপ্রান্তরের কী ব্যাখ্যা লিখিব? এখানে ধনী-নির্ধন, রাজা, বাদশাহ, ভিখারি সাধারণ সব একবেশে উপস্থিত। এই দৃশ্য অতীব মনোরম এবং তৃপ্তিকর। দয়াময়ের অপরিসীম লীলা! তাহার কণামাত্র বুঝিবার ক্ষমতা মানুষের নাই।২৪
বাংলা সাহিত্যে মোহাম্মদ বদরুদ্দোজা ও ইয়াসিন আলী সরকার বিশিষ্ট বা পরিচিত কেউ না। কিন্তু এই একটিমাত্র লেখার দ্বারা তাঁরা তাদের প্রতিভার বিশিষ্টতাকে প্রদর্শন করতে সমর্থ হয়েছেন। বাংলা ভ্রমণ সাহিত্যে শুধু নয়, বাংলা সাহিত্যের সামগ্রিক বিবেচনাতেই তাদের গদ্য-ভাষা ছিল যুগপৎ কারুকার্যময়, চিত্রল ও ভাব-গাম্ভীর্যে পরিপূর্ণ।
লেখক পরিচিতি: লেখক, গবেষক ও প্রবন্ধকার