আবু সুফিয়ান

মাঝেমধ্যেই লোকজন আমাকে প্রশ্ন করে, আপনি একাউনটিং নিয়ে পড়েছেন, হিসাবকিতাব করবেন, ভালো চাকরি করবেন, বড় ক্যারিয়ার বানাবেন, সেসব না করে বই লেখেন, নাটক লেখেন—এইসব হাবিজাবি করেন। লেখক হলেন। হিসাববিদ্যার এমন ক্যারিয়ার বাদ দিয়ে লেখক হলেন কেনো? আপনি আসলে কী হতে চেয়েছিলেন?
প্রশ্ন শুনে কদাচিৎ আমারও নিজের কাছে জানতে ইচ্ছা করে আমি আসলে কী হতে চেয়েছিলাম?
এই প্রশ্নের উত্তর কি হতে পারে?
আমি কী লেখক হতে চেয়েছিলাম?
ছোটবেলায় আমাদের একটা রচনা পড়তে হতো-মাই এইম ইন লাইফ। সেখানে প্রায় সবাই-ই লিখতো বড় হয়ে ডাক্তার হবো। এনজিনিয়ার হবো। শিক্ষক হবো। আমিও সেসবই পড়েছি। কিন্ত মনে মনে ঠিক করে রেখেছি আমি বড় হলে মেথর হবো। মেথর মানে সুইপার। কথাটা শুনতে খারাপ লাগে, কিন্ত ঘটনা সত্যি।
কম বয়সে মঙ্গলা নামে এক সুইপারের সাথে আমার সখ্য হয়ে গিয়েছিলো। ঢাকা শহরে এখর যেমন গাড়ি দিয়ে ডাস্টবিনের ময়লা নেয়া হয়, আজ থেকে ত্রিশ-পয়ত্রিশ বছর আগে সেরকম ছিলো না। সেসময় গরুর গাড়িতে ময়লা নেয়া হতো। সুইপারদের সাথে একটা কখনোবা দুইটা গরু থাকতো। সেই গরুও খুবই বড় ছিলো। হেভী ছিলো। আস্তে আস্তে হাঁটতো। গুঁতাগাতি দিতোনা।
মঙ্গলা মেথরের গরুটা ছিলো লাল। উনি নিজে মদ খেতেন। গরুকেও খাওয়াতেন। মদ খাওয়া সেই গরুর স্বাস্থ্য ছিলো বিশাল। এত বড় গরু যে আজকের কোরবানির বাজারে লক্ষ টাকার বেশি দাম হবে। অথচ মঙ্গলা যা বলতো সেই গরু তাই মানতো। এই ব্যাপারটা আমাকে আকৃষ্ট করেছিলো। মঙ্গলার মতো সুইপার হলে এরকম একটা গরুও আমার থাকবে যে আমার কমান্ড মানবে।
এর কিছুদিন পরে মঙ্গলা মারা যায়। মঙ্গলা মারা যাওয়ার খবর শুনে আমি সুইপার কলোনিতে গেলাম। আমি তখন পরান ঢাকায় থাকি। সেসময় জায়গাটাকে বলতো মেথরপট্টি। মঙ্গলার শোকে কান্নায় অমার চোখমুখ তখন ফাটে ফাটে অবস্থা! কিন্ত আশ্চর্যের ব্যাপার হলো সেখানে গিয়ে দেখি মঙ্গলার মৃত্যু উপলক্ষে মেথরপট্টিতে আনন্দ উৎসব শুরু হয়েছে। মদ-পানি খাওয়া-খাওয়ি হচ্ছে। শুকর পোড়া দিয়ে কাবাব খাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে তার আত্মীয়-স্বজন। আমি তাজ্জব হয়ে গেছি। মনটা ভীষণভাবে কেঁদে উঠলো। হায় খোদা! আমি যদি মেথর হই এবং একদিন মারা যাই তাহলে আমার মৃত্যু উপলক্ষেওতো এরা খুশি করবে। শুকর পোড়া দিয়ে খাবে। মানুষের মৃত্যুর মতো শোকের ঘটনায় যারা আনন্দ- উল্লাস করে তাদের সাথে আমার জীবন মেলাতে পারিনা। আমার মেথর হওয়ার ইচ্ছা সেদিনই শেষ হয়ে গেলো।
আমার মা একসময় খুব অসুস্থ থাকতেন। বাড়িতে ডাক্তার এসে প্রায়ই তাকে স্যালাইন দিতো স্যালাইন দিলে তিনি খানিকটা বলশক্তি ফিরে পেতেন। আমাদের বাসায় ডাক্তার চাচাকে দেখে দেখে একসময় ডাক্তার হতে ইচ্ছা করলো। ডাক্তার হলে অসুস্থ্য মানুষকে সুস্থ্য করা যায়। স্যালাইনের সব খালি ব্যাগ এবং সুইগুলো জমা করতাম। বাবার একটা ভাঙ্গা পুরাতন ব্রিফকেসে সেগুলো রেখেছি। খালি ঘরে মাঝে মাঝে সেই ব্যাগটা নিয়ে ডাক্তার চাচার ভঙ্গিতে হাঁটাহাঁটি করি। আয়নায় নিজেকে দেখি। এগুলো ছিলো ডাক্তার হওয়ার পূর্ব পূর্ব প্রস্তুতি। মনে খুব পিপাসা যদি কাউকে ডাক্তার চাচার মতো স্যালাইন দিতে পারতাম! তকদিরও আমার ফেভার করলো। এক সকালে দেখি এক কাকের বাচ্চা অসুস্থ হয়ে আমাদের উঠানে পড়ে আছে। তার হাঁটাচলা দেখে বুঝলাম-শরীর খারাপ। দুর্বল। মাথায় বুদ্ধি এলো, একে স্যালাইন দিলে বল ফিরে পাবে। বিলম্ব না করে আমার ব্যাগ থেকে যন্ত্রপাতি বের করলাম। ব্যাগে পানি ভরে শুই রেডি করলাম। বাচ্চা কাকের হাত পা বেঁধে তাকে স্যালাইন পুশ করলাম। ফল যা হওয়ার তাই হলো। কাকের পেট ফেটে গেলো। আমারও ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছা সেখানেই শেষ।
এক বিকালে বাড়িতে আমার দাদী এলেন। সাথে বড়বড় দুটা লোহার চামচ নিয়ে এলেন। ঐসব চামচ বাবুর্চিরা বড় অনুষ্ঠানে ব্যবহার করে। দাদীর চামচের হাতলের জোড়া খুলে গেছে, দয়াগঞ্জের বাজারে ঝালাই দেয়ার জন্য নিয়ে এসেছেন। আমি সেই চামচ দেখে হাতাপাতা করলাম। অল্প সময়ের মধ্যেই হাতুরি দিয়ে পিটাপিটি করে ভাঙ্গা চামচ ঠিক করে ফেললাম। দাদীতো মহা মুগ্ধ। খুশি হয়ে আমাকে মজুরি বাবদ চল্লিশ পয়সা দিয়ে দিলেন। ওটা আমার জীবনেরও প্রথম কামাই। আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে মোটামোটি একটা নাম হয়ে গেলো আমি মিস্ত্রী কাজ ভালো করি। আমার বাবা নিশ্চিত ভঙ্গিতে সবাইকে বলতেন আমার মেজো ছেলে এনজিনিয়ার হবে।
তার উৎসাহে আমি ঘরের ভাঙ্গাচোরা জোড়াজারির কাজ খোঁজা শুরু করলাম। কিছু না পেয়ে শেষে ভালো জিনিস নষ্ট করি। সেই নষ্ট জিনিস ঠিক করা নিয়ে দিন পার করি। নয়তো হাত শুলায়। অস্থির হই। মহা যন্ত্রনা। এরমধ্যে আমাদের টেলিভিশন খারাপ হয়ে গেলো। একজন মেকানিক এলেন। উনি টিভির বক্স খুলে ভেতরে শুধু ঝালাই দেন। যে যন্ত্রটি দিয়ে ঝালাই দেন তার নাম ‘ইলেকট্রিক তাতল’। কারেন্টে চলে। বিষয়টি আমাকে মুগ্ধ করে।
বাবাকে বলেকয়ে পঁচাত্তর টাকা দিয়ে নবাবপুর থেকে একটা তাতল যোগাড় করি। সেই গরম তাতল শীসার ওপর ধরলে শীসা গলে যায়। প্রথম দিনেই তাতলের প্ল¬াগ লাগিয়ে হাত দিয়েছি, মুহুর্তের মধ্যেই ২২০ ভোল্ট বিদ্যুৎ আমাকে কামড় দিয়ে ধরেছে। কাঁপতে কাঁপতে ত্রিশ-চল্লিশ সেকেন্ড পরে আছাড় খেয়ে পড়েছি। খুবই ভয় পেয়েছি সেদিন। এই তাতল মহা আপদ! যে কোনো সময় বিপদ ঘটবে সেই আশঙ্কায় আমাদের এক আত্মীয়কে ডেকে আল্লাহরওয়াস্তে সেই তাতল দান করে দেয়া হলো। আমার এনজিনিয়ার হওয়ার ইচ্ছাও সেদিন থেকে শেষ।
জীবনে প্রথম লঞ্চে উঠে সারেং এর পাশে বসেছিলাম। তার হুইল ড্রাইভ দেখে ঠিক করেছিলাম বড় হলে লঞ্চের সারেং হবো। আবার ঘটনাক্রমে পবন নামে মিনিবাসের এক দুর্দান্ত ড্রাইভারের গাড়ি চালানো দেখে জীবনের লক্ষ ঠিক করেছিলাম ড্রাইভার হবো। জীবনে প্রথমবার এয়ারপোর্টে গিয়ে বিমান দেখে সিদ্ধান্ত নিলাম পাইলট না হলে জীবনই বৃথা।
ক্লাস সিক্সে যখন পড়ি তখন আমাদের স্কুলে দেশের প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান হঠাৎ করে একদিন চলে এলেন। ছাত্ররা সবাই তাকে দেখতে এবং হাত মেলাতে গেলো। আমিও গেছি। সিকিউরিটির এক লোক ধাক্কা দিয়ে আমাকে সরাতে যেয়ে ফেলে দিলো। দুই তিনজনের পাড়া খেলাম। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেলো । মনে মনে ভাবলাম যদি প্রেসিডেন্ট হতে পারতাম! এরপর ঘুমের মধ্যে একদিন স্বপ্ন দেখি প্রেসিডেন্ট হয়েছি। অনেক গার্ড, আর্মি আমাকে ঘিরে রেখেছে। আমি কোথাও যেতে পারিনা। অস্থির অবস্থায় আমার ঘুম ভেঙ্গে গেলো। প্রেসিডেন্ট হওয়া মানে বন্দি জীবন; আমি বন্দি জীবন চাইনা। প্রেসিডেন্ট হওয়ার ইচ্ছাও একসময় চলে গেলো।
এরপরে অনেক সময় আমি ভাবতাম বিচারক হবো। ন্যায় বিচার করবো। পরে বুঝলাম মনুষ্য জীবনের সবচেয়ে কঠিন কাজ হচ্ছে বিচার করা। এখনতো অনেকে বিচারক হওয়ার পরেও বিব্রতবোধ করেন। আমি ঐ কম বয়সেই বিচারক হওয়ার আগেই বিব্রত হয়েছি ।
বহু ভেবেচিন্তে দেখলাম আমি আসলে সবই হতে চাই। কিন্ত এক জীবনে একসাথে সবকিছূ সরাসরি হওয়া কী সম্ভব?
মোটেই সম্ভবনা। শুধু একটি ক্ষেত্র ছাড়া। সেটা হচ্ছে লেখক হওয়া।
একজন লেখকই কখনো মেথর হতে পারে, কখনো ডাক্তার, কখনো এনজিনিয়ার, পাইলট, বিচারক, লঞ্চের সারেং কিংবা বাসের ড্রাইভার হতে পারে। যা ইচ্ছা, একজন লেখক তা হতে পারে তার কল্পনার মাধ্যমে। তার লেখার মাধ্যমে। একমাত্র এই মাধ্যমেই সম্ভব এক জীবনে অনেক কিছুর স্বাদ পাওয়া।
যারা প্রশ্ন করেন আমি হিসাববিদ্যা বাদ দিয়ে কেনো লেখালেখি করি – সেই প্রশ্নের খানিকটা উত্তর কি দেয়া হলো?
জানি না।
লেখক পরিচিতি: উপন্যাসিক, নাট্যকার, নাট্যপরিচালক, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, গবেষক, ‘ভ্রমণ’ ম্যাগাজিনের সম্পাদক