ভূমধ্যসাগরের ব্যালকনি আলজেরিয়া: যেখানে মরুভূমি আর সাগর মিলেমিশে হয়েছে একাকার..

ভূমধ্যসাগরের নীল জলরাশি থেকে শুরু করে সাহারার সোনালি বালিয়াড়ি পর্যন্ত বিস্তৃত আলজেরিয়া নির্জন মহিমা ও আকর্ষণীয় বৈপরীত্যের এক দেশ। আফ্রিকার সবচেয়ে বড় এই রাষ্ট্র ইতিহাস, সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অনন্য সংমিশ্রণ, যা এখনো পর্যটনের ভিড়ে অনাবিষ্কৃত এক রত্ন। ১ নভেম্বর আলজেরিয়ার ৭১তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে ভ্রমণ ম্যাগাজিনের বিশেষ পর্যটন নিবন্ধ ‘ভূমধ্যসাগরের ব্যালকনি আলজেরিয়া: যেখানে মরুভূমি আর সাগর মিলেমিশে হয়েছে একাকার..

সভ্যতার রঙিন বুনন

প্রাচীন রোমান নগর টিমগাদ ও জেমিলার ধ্বংসাবশেষ থেকে শুরু করে ত্লেমসেন ও আলজিয়ার্সের কাসবা–র ইসলামিক স্থাপত্য সব মিলিয়ে আলজেরিয়া যেন এক জীবন্ত ইতিহাস জাদুঘর। এখানে ঘুরে বেড়ানো মানে সময়ের ভেতর দিয়ে হাঁটা; একদিকে ধ্বংসপ্রাপ্ত অ্যাম্ফিথিয়েটার, অন্যদিকে ওসমানীয় প্রাসাদ ও ফরাসি উপনিবেশিক স্থাপত্যে ভরা সড়ক। আলজিয়ার্সের কাসবা, ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান, আজও উত্তর আফ্রিকার সবচেয়ে জীবন্ত পুরনো নগরচিত্রগুলোর একটি যার সাদা দেয়াল ও সরু গলি যেন জলদস্যু, কবি ও বিপ্লবীদের কাহিনি শুনিয়ে যায়।

সাহারার আহ্বান

দক্ষিণে এগোলে প্রাকৃতিক দৃশ্য পাল্টে যায় নাটকীয়ভাবে। দেশের চার-পঞ্চমাংশ জুড়ে বিস্তৃত সাহারা মরুভূমি নীরবতার এক অসীম মহাসাগর। তামানরাসেত ও হগার পর্বতমালায় সময় যেন থমকে থাকে; কালো পাথরের শৃঙ্গগুলো প্রাচীন প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে বাতাস ও আলোর আঁকা এক বিস্ময়কর ভূদৃশ্যে। এখানকার তুয়ারেগ জনগোষ্ঠী, যাদের বলা হয় “মরুভূমির নীল মানুষ”, অতিথিদের চা, গল্প ও ঐতিহ্যবাহী আতিথেয়তায় স্বাগত জানায়।

ভূমধ্যসাগরীয় ছন্দ

উত্তরের উপকূলে ফুটে ওঠে ভূমধ্যসাগরীয় সৌন্দর্যের অন্যরূপ খেজুরবনে ঘেরা উপসাগর, প্রাণবন্ত বাজার আর সমুদ্রতীরের কফিশপে মিশে থাকে সংস্কৃতি ও সুর। রাজধানী আলজিয়ার্স এর শহুরে জীবন, পুরনো ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মিশেলে গড়ে উঠেছে।

এখানে ফরাসি উপনিবেশিক স্থাপত্যের পাশে দেখা যায় সমকালীন শিল্পচর্চা। ওরান ও আনাবার মতো উপকূলীয় শহরগুলো সঙ্গীত, তারুণ্যের উদ্দীপনা ও আফ্রিকা-ইউরোপের সাংস্কৃতিক সংযোগে ভরপুর।

অতুলনীয় প্রকৃতির রাজ্য

শহর ও মরুভূমির বাইরে আলজেরিয়া গর্ব করে তার পর্বত ও অরণ্যে। টেল আটলাস ও অরেস পর্বতমালার সিডার বন আর ঐতিহ্যবাহী বারবার গ্রামগুলো প্রকৃতির মায়ায় ভরা। আহাগগার জাতীয় উদ্যান ও তাসিলি ন’আজ্জের– প্রাগৈতিহাসিক শিলাচিত্র পৃথিবীর সবচেয়ে আশ্চর্য নিদর্শনের মধ্যে অন্যতম, যেখানে ভ্রমণ, আলোকচিত্র কিংবা নিঃস্তব্ধ ধ্যান সবই এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা।

আলজেরিয়া ভ্রমণ মানে শতাব্দীর ইতিহাস আর পরিচয়ের স্তর অতিক্রম করা। এই দেশ কৌতূহল ও সম্মানবোধ নিয়ে আগত অতিথিদের পুরস্কৃত করে অকৃত্রিম অথচ পরিশীলিত অভিজ্ঞতায়। কেউ যখন প্রাচীন বাণিজ্যপথে হাঁটবে, মরুভূমির তারা ভরা আকাশের নিচে কুসকুস খাবে, কিংবা সূর্যাস্ত দেখবে বালিয়াড়ির পেছনে আলজেরিয়া তাকে ধীর গতিতে চলতে শেখাবে, হয়তো বদলে দেবে দারুনভাবে।

মিহির আলতাফ আমীর আলী

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!